Showing posts with label Islam. Show all posts
Showing posts with label Islam. Show all posts

মূর্তি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের লেখা : বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

সম্প্রতি কল্পকথার গল্পে বিভোর হুমায়ুন আহমেদের লেখা থেকে (প্রথম আলো, ২৭ অক্টোবর) জনমনে একটা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। আমি প্রথমে সে অংশটুকু উদ্ধৃত করছি। “আমাদের মহানবী (স: ) কাবা শরিফের ৩৬০ টি মূর্তি অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেয়ালের সব ফ্রেসকো নষ্ট করার কথাও তিনি বললেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি পড়ল কাবার মাঝখানের একটি স্তম্ভে। যেখানে বাইজেন্টাইন যুগের মাদার মেরির একটি অপূর্ব ছবি আঁকা। নবীজী স: সেখানে হাত রাখলেন এবং বললেন, ‘এই ছবিটা তোমরা নষ্ট করো না’। কাজটা তিনি করলেন সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর অসীম মমতা থেকে। মহানবীর স: ইন্তেকালের পরেও ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ খলিফাদের যুগে কাবা শরীফের মতো পবিত্র স্থানে এই ছবি ছিল। এতে কাবা শরিফের পবিত্রতা ও শালীনতা ক্ষুন্ন হয়নি। মহানবীর স: প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাকের (আরব ইতিহাসবিদ, জন্ম: ৭০৪ খৃষ্টাব্দ মদিনা, মৃত্য: ৭৬৭ খৃষ্টাব্দ বাগদাদ) লেখা দি লাইফ অব মোহাম্মদ গ্রন্থ থেকে ঘটনাটি বললাম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছেন আলফ্রেড গিয়োম (প্রকাশকাল ২০০৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫৫২)”

আলফ্রেড অনূদিত ‘দি লাইফ অব মুহাম্মদ’ গ্রন্থটি খৃষ্টান লোকদের নবীবিদ্বেষী মনোভাবের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বৈ কিছুই নয়। হুমায়ুন আহমেদ সেই রচনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের ভাবতেও অবাক লাগে খৃষ্টানদের ইসলামের নবীবিদ্বেষী লেখাকে তিনি বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া কিভাবে গ্রহণ করলেন?

প্রথমে ইবনে ইসহাক সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। তিনি রাসূলুল্লাহর স: প্রথম জীবনীকার। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করে গিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার কোনটিই আজ অবশিষ্ট নেই। তার মৃত্যুর পর তার ছাত্র ‘বাক্কাকী’ তার কাজগুলো সম্পাদনা করে আবার লিখেন। কিন্তু সেগুলোও পরে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাক্কাকীর ছাত্র ‘ইবনে হিশাম’ তা পুনরায় সম্পাদনা করে নবীজীর স: জীবনী গ্রন্থ লিখেন, যা আজো ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ নামে আমাদের কাছে আছে। ইবনে ইসহাকের অপর এক ছাত্র ‘সালামা ইবনে ফজল’। তিনিও বাক্কাকীর ন্যায় ইবনে ইসহাকের কাজগুলো সম্পাদনা করেন। কিন্তু কালক্রমে তাও হারিয়ে যায়। এরপর সালামার ছাত্র ‘ইবনে জারীর তাবারী’ তা পুণরায় সম্পাদনা করেন। তার সম্পাদনাটি বর্তমানে ‘তারীখে তাবারী’ নামে আমাদের হাতে আছে। ইবনে হিশাম আর তাবারীর রচনার মাঝে পার্থক্য হল, ইবনে হিশাম তার সম্পাদনাকালে ইবনে ইসহাকের ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলো বাদ দিয়েছেন এবং আরো কিছু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা যোগ করেছেন। আর তাবারী ইবনে ইসহাকের অধিকাংশ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন এবং নিজেও অনেক বর্ণনা যোগ করেছেন। এতে তিনি ইবনে হিশামের মত এত সতর্কতা অবলম্বন করেননি। আলফ্রেড গিয়োম ১৯৫৫ সালে তাবারী ও ইবনে হিশাম থেকে কেবল ইবনে ইসহাকের বর্ণনাগুলো সংকলন করে দি লাইফ অব মোহাম্মদ গ্রন্থটি লিখেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তা ২০০৩ ও ২০০৬ এ পুণ:মুদ্রিত হয়। (উইকিপিডিয়া অনলাইন)

এবার আসা যাক কাবা শরিফের ভেতর মাদার মেরির ছবি প্রসঙ্গে। ইবনে ইসহাকের জীবনী গ্রন্থের দুই ধারক তাবারী ও ইবনে হিশাম কেউই এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেন নি। এ দুটো জীবনী গ্রন্থ ছাড়াও প্রসিদ্ধ-অপ্রসিদ্ধ কোন জীবনী গ্রন্থেই এর উল্লেখ নেই। তাহলে প্রশ্ন, আলফ্রেড গিয়োম তা পেলেন কোথা থেকে? ‘আখবারে মাক্কা’ নামে ‘আযরাকী’ রচিত এক ইতিহাস গ্রন্থ হতে এ বর্ণনা পাওয়া যায়। আলফ্রেড গিয়োম সেখান থেকে তা নিজে সংযোজন করেছেন,এটা ইবনে ইসহাকের কোন বর্ণনা নয়।

আর ‘আখবারে মাক্কা’..?। আল্লামা আব্দুর রহমান বিন ইয়াহয়া মুয়াল্লিমী (মৃত্যু: ১৩৮৬ হি: ) তার মাকামে ইব্রাহীম কিতাবে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করে বলেন, “আযরাকী তো নিজের ব্যাপারেই নির্ভরযোগ্য নয়। কোন ইমাম তাকে নির্ভরযোগ্য বলেননি। ইমাম বুখারী, ইবনে আবি হাতিম, কেউই তার বর্ণনা আনেননি। বরং “আল ইকদুস সামীন” গ্রন্থে গ্রন্থকার তার জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, আমি কাউকে তার জীবনী উল্লেখ করতে পাইনি। অতএব সে হাদীস বিশারদদের নিয়মানুসারে ‘মাজহুল’, যার পরিচয় অজ্ঞাত।” (মাকামে ইব্রাহীম, পৃ:৫৬) সুতরাং, তার কথা নির্ভরযোগ্য নয়।

এখন যে বর্ণনা নিয়ে এত হট্যগোল সে প্রসঙ্গে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আযরাকী উক্ত বর্ণনা চারটি সুত্রে বর্ণনা করেন। যার প্রতিটিই বিচ্ছিন্ন সুত্র, অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ও গোজামিল বক্তব্য থাকায় হাদীস বিশারদদের কাছে একেবারেই গ্রহণ যোগ্য নয়। এর বিপরীতে জাবের রাঃ বর্ণনা করেন, “মক্কা বিজয়ের দিন নবী (সাঃ) ওমর (রাঃ) কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি কাবা শরিফের ভিতরের সব ছবি নষ্ট করে দেন। অতঃপর ছবি নষ্ট করার আগে নবী (সাঃ) কাবা শরিফের ভিতর প্রবেশ করেন নি। (আবু দাউদ, বায়হাকী, আহমদ) এছাড়া আযরাকীর উক্ত বর্ণনা টা বুখারী তে এভাবে এসেছে, “নবী (সাঃ) যখন কাবা শরিফের কাছে আসলেন, তখন তিনি তাতে মূর্তি থাকাবস্থায় প্রবেশ করতে সংকোচ করলেন। এরপর তিনি নির্দেশ দিলে সেগুলো বের করা হল। তখন সেখানে ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ) এর মূর্তিও ছিল, তাদের হাতে ভাগ্য নির্ধারণী তীর ছিল। নবীজী (সাঃ) তা দেখে বললেন, আল্লাহ তাদের (যারা এগুলো বানিয়েছে) ধ্বংস করুন। তারা কি জানত না যে, ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ) কখনো এসব ভাগ্য নির্ধারণী তীর ব্যবহার করেননি? এরপর তিনি কাবা শরিফে প্রবেশ করলেন এবং চতুর্দিকে তাকবীর ধ্বনি দিলেন, তবে তাতে কোন নামাজ পড়লেন না। (বুখারীঃ ১:২১৮, আবু দাউদ:১:২৭৭, রশীদিয়া লাইব্রেরী দিল্লী) এভাবে হাদিসের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য কিতাবেও এসেছে। এর পরের যে অংশটুকু আযরাকী বর্ণনা করেন যে, নবীজী (সাঃ) ঈসা ও মরিয়ম (আঃ)-এর ছবি নষ্ট করতে নিষেধ করেন, তা কেউ বর্ণনা করেন নি। এটি সম্পূর্ণই বানোয়াট।

এ প্রসঙ্গে আরো কিছু বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে- উসামা বিন যায়দ (রাঃ) বলেন, আমি নবীজীর (সাঃ) সাথে কাবা শরিফের ভিতর প্রবেশ করলাম। তিনি তাতে কিছু ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি এক বালতি পানি আনতে বললেন। আমি আনলাম। এরপর তিনি তা দিয়ে সেগুলো মুছে দিলেন এবং বললেন, “আল্লাহ ঐ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করুন, যারা এমন জিনিসের আকৃতি দেয় যা তারা সৃষ্টি করতে পারবে না”। (আবু দাউদ) এ হাদিস অনুসারে নবীজী (সাঃ) স্পষ্টতই সব ছবি নষ্ট করেন এবং এতে ঈসা ও মরিয়ম (আঃ)-এর আকৃতি অক্ষুন্ন থাকার কোন প্রমাণ নেই। অপর বর্ণনায় আছে, “ওমর (রাঃ) কাবার ভেতরে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) এর মূর্তি দুটো প্রথমে নষ্ট করেননি। নবীজী (সাঃ) ভেতরে ঢুকে তা দেখে বললেন, ওমর, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, ভেতরে কোন মূর্তি বা ছবি রাখবে না। আল্লাহ তায়ালা এর নির্মাতাদের ধ্বংস করুন। এরপর তিনি মরিয়ম (মেরি)-এর ছবি দেখতে পান। তখন তিনি বলেন, এখানে যত ছবি আছে সব মুছে দাও। আল্লাহ ঐ সম্প্রদায় কে ধ্বংস করুন যারা এমন কিছুর আকৃতি দেয়, যা তারা সৃষ্টি করতে পারে না। (ওয়াকিদী)

বলতে পারি আমরা স্পষ্টতই বলব, কাজটা যে নবী (সাঃ) সৌন্দর্য্যরে প্রতি তাঁর অসীম মমতাবোধ থেকে করেছেন, তাতো স্পষ্ট নয়। আযরাকীও তো এ কথা বর্ণনা করেননি। তাহলে কি তা জাল হাদীসের মাঝে মনগড়া সংযোজন নয়? এভাবে একটা দুর্বল, বানোয়াট, জাল ও ভিত্তিহীন হাদীসের ভিত্তিতে ইসলামে এত বড় বিভ্রান্তি ছড়ানো কি ঠিক? ছবি ও মূর্তি হারাম হওয়ার ব্যপারে নবীজী (সাঃ) এর অসংখ্য বর্ণনা, যার কিছু আমরা উল্লেখ করেছি, এর বিপরীতে এই দুর্বল বর্ণনা কতটুকু গ্রহণযোগ্য? এটা কি নাটক-উপন্যাসের মত ইসলামের স্পর্শকাতর বিধানে অসতর্ক হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস নয়? আর ভাস্কর্য তো সর্বকালের সকল ইমামদের মতেই নিষিদ্ধ, কোনরূপ দ্বিমত নেই তাতে। এছাড়া ছবির বর্ণনা দিয়ে ভাস্কর্যের বৈধতার প্রমাণই বা হয় কিভাবে? কাবা শরিফে পূজোর মূর্তি ধ্বংস করার পরও ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) এর দুটো মূর্তি ছিল। যেগুলো পূজোর নয়, বরং আরবরা তা ভাগ্য নির্ধারণে ব্যবহার করত। সেগুলো তাদের জন্য মডেল ও সৌন্দর্য্যরে প্রতীক ছিল। কিন্তু আফসোস! সৌন্দর্য্যরে প্রতি অসীম মমতা যে নবীর (সাঃ), তিনি নিজেই সেগুলো নির্মমভাবে ভাঙতে নির্দেশ দিলেন। আবার সাথে সাথে জোর কণ্ঠে এও বললেন, “আল্লাহ এর নির্মাতাদের ধ্বংস করুন”। আমার মনে হয়, হুমায়ুন সাহেবের নজরে মূর্তির এই হাদিসটি আসেনি। কিন্তু এতসব ‘ইন্টেরেস্টিং ব্যাপার’র মাঝে কি ইসলামের ব্যাপারে অজ্ঞতা, মূর্খতা ও সতর্কহীনতাই ফুটে উঠে না? নাকি এটা ‘বড় বড় লেখকের চরম ভুল’। সে যাই হোক, একটা কথা না বললেই নয়, হুমায়ুন সাহেব কিন্তু নবীজীর (সাঃ) ফুল-প্রীতির হাদিস দিয়েই তাঁর সৌন্দর্য্য প্রীতির প্রমাণ দিতে পারতেন। খুঁজে খুঁজে এই জাল হাদীস উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন ছিল না।

তবে যেগুলো অসম্পূর্ণ, শুধু একটি হাত, বা পা ইত্যাদি, সেগুলো হারাম নয়। আয়েশা (রা: ) এর পুতুলটি এমনি ছিল। তা মূলত একটি কাপড়ের দলা ছিল, যাকে তিনি পুতুল বলে উল্লেখ করেছেন। নবীজী (সাঃ) এটাকে নিছক কাপড়ের দলা দেখেই প্রশ্ন করেছেন, আয়েশা! এটা কি? অন্যথায় সম্পূর্ণ পুতুল হলে প্রশ্ন করার প্রয়োজনই পড়ত না। আর এটাকে আয়েশা (রাঃ) সুলায়মান (আঃ) এর ঘোড়ার ন্যায় ঘোড়ার পুতুল বলাতেই নবীজী (সাঃ) হেসে মজা করেছেন। এ কথাটুকুই হুমায়ুন সাহেবের ভাষায়, “আমরা সবাই জানি, হযরত আয়েশা (রাঃ) নয় বছর বয়সে নবীজীর (সাঃ) সহধর্মিনী হন। তিনি পুতুল নিয়ে খেলতেন। নবীজীর তাতে কোন আপত্তি ছিল না, বরং তিনিও মজা পেতেন এবং কৌতূহল প্রদর্শন করতেন।” নবীজীর আপত্তি ছিল না কারণ তা ছিল অসম্পূর্ণ। আর এটাকে আয়েশা (রাঃ) ঘোড়া বলে উল্লেখ করায় তাঁর শিশুসুলভ আচরণে নবীজী (সাঃ) হাসেন।

সারকথা, ইসলাম মূর্তিকে অনুমোদন করে না। তা উপাসনার জন্যই হোক আর অন্য কোন কারণেই হোক।

হুমায়ুন সাহেব ইরান ও লিবিয়ায় এবং শেখ সাদী ও শেখ ফরিদদুদ্দীন আত্তার (রহঃ)-এর মাজারের সামনে ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। কোথায় কি ভাস্কর্য আছে তা ইসলামের দলিল নয়। দলিল হলো কোরআন ও হাদিস।

------------------------------------------
প্রথম প্রকাশ: ইনকিলাব > ১২ই নভেম্বর > ফিচার > আদিগন্ত > পৃষ্ঠা নং: ৪-৭
দ্বিতীয় প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ

প্রসঙ্গ: এপ্রিল Fool: আসুন একটু ভাবি..

[এক]

দৃশ্য:১:
করিম ঘুম থেকে উঠে বাজারে গেল। সেলিম বলল, ‘কাল তোর বউরে দেখলাম পাশের বাড়ীর আকিলুদ্দীর লগে ইটিশ-পিটিশ করতাছে’। ব্যাস, করিম শোঁ করে বাড়ি এসে স্ত্রীকে রাগের মাথায় অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল। সেলিম করিমের খুব পুরনো বন্ধু। তাই তার কথা অবিশ্বাস করার কিছু নেই। আবার করিমও সেলিমের খুব রসিক বন্ধু। কিন্তু হঠাৎ যে সে এত রেগে যাবে, ভাবতেই পারে নি। ফল কী হলো? একটি সংসারে ভাঙন ধরল। অথচ সেলিম সিরফ করিমকে এপ্রিল ফুল বানাতে চেয়েছিল, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

দৃশ্য:২:
করিম অফিসে বসে আছে। কাজে খুব ব্যস্ত। হঠাৎ সেলিমের ফোন আসল, ‘তোর মা... আর নেই... তাড়াতাড়ি বাসায় আয়’। করিম হুড়োহুড়ি করে সবকিছু ছেড়ে বাসায় ফিরে দেখল ঘটনা কিছুই না, মা সুস্থ আছেন। কয়েক বন্ধু একসাথে হয়েছে এই আর কি। আর মাঝে দিয়ে করিম হয়ে গেল ‘এপ্রিল ফুল’।

দৃশ্যগুলো বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। বাস্তবে এমন তেমনটা হয় না। কিন্তু বাস্তবে যা হয়, তা কিন্তু আবার কল্পনায়ও আসে না। প্রায়ই এপ্রিলের দুই তারিখে পত্রিকার পাতায় শিরোনাম দেখা যায় ‘নির্মম এপ্রিল ফুল’, ‘এপ্রিল ফুলের বলি হলো নিস্পাপ ছেলেটি’ –ইত্যাদি।

ইউরোপে ১৭৪৬ ঈশাব্দে ‘Evening Star’ নামের এক পত্রিকা ঘোষণা দিল যে, আগামীকাল ১লা এপ্রিলে অমুক জায়গায় গাধার প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে। উৎসুক জনতা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। অপেক্ষা করতে করতে যখন আর সইল না তখন আর বুঝতে বাকী রইল না যে, পত্রিকার ঘোষিত গাধা তারাই। তাদেরকে ‘এপ্রিল ফুল’ বানানো হয়েছে।

আমাদের দেশে ক’দিন আগে অভিনেত্রী জয়াকে কেন্দ্র করে কী হলো তা মনে আছে তো? বিজ্ঞপ্তি শব্দটা উল্লেখ করে দেওয়ার পরও বেচারা ভক্তকুল তাকে হারানোর শোক সইতে পারছিল না। অনেকে অনেক রকম লেখা দিয়েছেন, বিবৃতি দিয়েছেন। জয়াকে নিয়ে নিজেদের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন। কেউ আবার কান্নাকাটিও করেছেন। শেষে কী হলো? দেখা গেল, ওটা ছিল সিরফ একটা বিজ্ঞাপন, আর সবাই হয়েছে ‘ফুল’। কিন্তু তারপরও সাধারণ জনগণসহ সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীগণ তার তীব্র নিন্দা করলেন। কেন করলেন?

এই ঘটনাটাই যদি এপ্রিলের এক তারিখে ঘটত, তাহলে এই ‘তারাই’ কিন্তু সেটাকে ‘এপ্রিল ফুল’ বলে হেসে উড়িয়ে দিতেন। কারণ ওই একদিনের জন্য তো সব বৈধ। কাউকে ফুল বানাতে সেদিন কোনো কুল-কিনারা-প্রাচীর-সীমানা নেই। যে, যেভাবে, যাকে ইচ্ছা, ‘ফুল’ বানিয়ে ফুল দিতে পারে। কেউ কিছু বলবে না।

[দুই]

প্রতিবছর এপ্রিল আসলে আমরা অনেক ইতিহাসবিদ দেখতে পাই। এপ্রিল ফুলের পেছনে কী ইতিহাস ছিল তা খোঁজার জন্যে অনেকেই রাত-দিন গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে যান। একদল প্রমাণ করে দেখান যে, এটার পেছনে একটি জাতির মর্মন্তুদ ইতিহাস রয়েছে, কাজেই তাদের পক্ষে এটা পালন করা সাজে না।

আরেক দল প্রমাণ করেন যে, ঐ ইতিহাস সম্পূর্ণ ভুল। বরং এর পেছনের ইতিহাস সিরফ মজার, তাতে কোনো কষ্ট-কান্না নেই। তাই তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-কর্ম নির্বিশেষে যে কেউ পালন করতে পারে। বরং আমাদের গুরুরা যেখানে তা পালন করছেন, আমাদের তা পালন না করলে কি চলে!

তার মানে কী দাঁড়াল? তার মানে দাঁড়াল এই যে, এই দিবসটা পালনের বৈধতা-অবৈধতা ঘুরপাক খাচ্ছে এর পেছনের ইতিহাসের সত্যতা-অসত্যতার মাঝে। যদি ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে এটা ঐ জাতির বিপক্ষে কোনো মর্মন্তুদ ষড়যন্ত্রের উপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছে, তাহলে তা পালন করা যাবে না। আর যদি তা প্রমাণিত না হয়, তাহলে তা ঠিকই পালন করা যাবে।

ব্যস, শুরু হয় দু’পক্ষের বাকযুদ্ধ। এক পক্ষ উইকিপিডিয়া, এনকার্টা, ব্রিটানিকা ইত্যাদি চষে দেখাবেন যে, ইতিহাসটা সহীহ না। আরেক পক্ষ মুসলিমপিডিয়া, ইসলামপিডিয়া ইত্যাদি দিয়ে দেখাবেন ইতিহাসটা সহীহ। আরে ভাই! যেটার প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে প্রকৃত ইতিহাসবিদরাই সন্দেহবিদ, সেখানে আমাদের মতো অনৈতিহাসিকদের ঐতিহাসিক হওয়ার কি কোনো মানে হয়? (প্লিজ কেউ রাগ করবেন না।)

সোজা কথায় আসি। ইতিহাস পক্ষে থাক বা বিপক্ষে থাক, সেটা কেন মূল আলোচনায় আসবে? প্রথমে দেখতে হবে, যে কর্মটা নিয়ে আমরা এত হইহই করছি, সেটার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু। ধর্মের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু মানবতাও কি এসব মিথ্যা-ধোকা সাপোর্ট করে? এই যে প্রতিবছর এটাকে কেন্দ্র করে এতসব অঘটন ঘটছে, এগুলো কি মানবতা বিরোধী নয়? বছরের ৩৬৪ দিন যা করলে মানুষ মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হয়, এই একদিন তা করলে কি সে Jokes-বাদী হয়ে যায়? বরং এই দু’মুখো আচরণের জন্য কি সে দু’মুখী ভন্ড হয়ে যায় না?

মিথ্যা মানুষের স্বাভাবিক বাকশক্তিকে ব্যাহত করে। সমাজে তার বিশ্বস্ততা কমিয়ে দেয়। পৃথিবীর কোনো ধর্ম-দর্শন মিথ্যার পক্ষে কথা বলে নি। বড় বড় মনীষীগণের জীবনী খুঁজলে দেখা যাবে যে, তারা জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত সত্যের উপর অবিচল থেকেছেন।

মানুষের মাঝে পশুত্ব আর দেবত্ব দুটোই কাজ করে। পশুত্বকে দমিয়ে রেখে দেবত্ব অর্জনের চেষ্টায় তাকে থাকতে হয়। তা হলেই কেবল মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। কিন্তু, তারপরও, পশুত্বই জয়ী হয় অধিকাংশ সময়ে। আর স্বেচ্ছায় সে পশুত্বকে, একদিনের জন্যে হলেও, আশ্রয় দিলে তো তা ঘাড়ে চড়ে বসবেই।

ধরুন, আপনি কখনো মিথ্যা বলেন না। কিন্তু একদিন বললেন, তো সেটা আপনার কাছে আগের মতো আর ভয়ানক মনে হবে না। যে কোনো পাপের ক্ষেত্রেই এটা হয়। যে পাপ থেকে আপনি সবসময় দূরে থাকেন, এড়িয়ে চলেন, একদিন কোনো ভাবে বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে যদি সেটা করে ফেলেন, তাহলে আগের মতো সে পাপ কাজটির প্রতি আর ঘৃণা থাকবে না। ভেতরের সুস্থ বিবেকটাও আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়বে। বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তার আর থাকবে না।

অনুরূপভাবে, আপনি একটি কাজকে নিষিদ্ধ বলে জানেন। একটি দিনের জন্যও যদি সেটি আপনার কাছে বৈধ বলে মনে হয়, আপনি যদি সেটা সেই একদিনই করে যান নির্দ্বিধায়, তাহলে তার নিষিদ্ধতা আপনার কাছে হালকা হয়ে যাবে। সেটা তখন করাটা আপনার কাছে অতটা জঘন্য মনে হবে না।

এ্যাডিকশন/ নেশার শুরুটা কিন্তু এভাবেই হয়। বন্ধুর হলুদের রাতে এক চুমুক, এরপর থার্টিফাস্ট নাইটে আরেক চুমুক... ব্যস... আস্তে আস্তে এ্যাডিক্টেড। প্রতিটি নেশাগ্রস্থ মানুষই কিন্তু প্রথম জীবনে নেশাকে ঘৃণা করে থাকে। কেউই কিন্ত জন্মগত এ্যাডিক্টেড নয়।

[তিন]

আমাদের মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা সত্যবাদী। তিনি সত্যকে ভালোবাসেন। সত্যবাদীকে ভালোবাসেন। মিথ্যাকে তিনি ঘৃণা করেন চরমভাবে। তিনি বলেন:

إنما يفتري الكذب الذين لا يؤمنون بآيات الله وأولئك هم الكاذبون

মিথ্যা কেবল তারা রচনা করে, যারা আল্লাহ্র নিদর্শনে বিশ্বাস করে না এবং তারাই মিথ্যাবাদী। (১৬:১০৫)

আমাদের প্রিয় নবীজীও স: মিথ্যাকে ঘৃণা করতেন। তিনি বলেন:

وعن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال آية المنافق ثلاث إذا حدث كذب وإذا وعد أخلف وإذا اؤتمن خان . رواه البخاري و مسلم

আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, নবী স: বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি। ১. কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। ৩. আমানত রাখা হলে তার খেয়ানত করে। (বুখারী-৩৩, মুসলিম-৫৯)

মিথ্যার বিভিন্ন স্তর আছে। এর সবগুলোই নিষিদ্ধ ও নিকৃষ্ট। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

১. আল্লাহ ও তাঁর নবী স: -সম্পর্কে মিথ্যা:

ولا تقولوا لما تصف ألسنتكم الكذب هذا حلال وهذا حرام لتفتروا على الله الكذب إن الذين يفترون على الله الكذب لا يفلحون

তোমাদের মুখ থেকে সাধারণতঃ যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে তেমনি করে তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করে, তাদের মঙ্গল হবে না। (১৬:১১৬)

وعن علي رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه وسلم : " لا تكذبوا عليَّ ؛ فإنه من كذب علي فليلج النار". رواه البخاري

আলী রা: বলেন, নবী সা: বলেছেন, আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলো না। যে আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলে সে যেন জাহান্নামে প্রবেশ করে। (বুখারী-১০৬)

২. ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা:

عن حكيم بن حزام رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " البيِّعان بالخيار ما لم يتفرقا - أو قال : حتى يتفرقا - فإن صدقا وبيَّنا بورك لهما في بيعهما ، وإن كتما وكذبا محقت بركة بيعهما " . رواه البخاري

হাকীম বিন হিযাম রা: বর্ণনা করেন, নবী স: বলেছেন, “বিক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হওয়া পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার চুক্তি ভঙ্গের অধিকার থাকে। (এরপর আর থাকে না।) যদি তারা ঠিক ঠিক বলে থাকে এবং সত্য বর্ণনা দিয়ে থাকে তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি তারা কিছু গোপন করে থাকে বা মিথ্যা বলে থাকে, তাহলে বরকত উঠে যাবে। (বুখারী:১৯৭৩, মুসলিম-৫৩২)

৩. যা শোনা তা-ই বর্ণনা করা:

عن حفص بن عاصم قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " كفى بالمرء كذباً أن يحدِّث بكل ما سمع " . رواه مسلم

হাফস বিন আসিম রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ স: বলেছেন: মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা-ই (যাচাই-বাছাই না করে) বর্ণনা করে। (মুসলিম:৫)

৪. ঠাট্টাচ্ছলে মিথ্যা বলা:

অনেকেই ভাবেন, ঠাট্টচ্ছলে মিথ্যা বলা তো কোনো সমস্যা না, তা তো ঠাট্টাই। যেমনটা এপ্রিল ফুলের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা, এবং তা নিষিদ্ধ। ঠাট্টা হোক আর সিরিয়াস হোক।

৫. বাচ্চাদের সাথে মিথ্যা বলা:

অনেকে এটাকে কোনো পাপই মনে করেন না। অথচ আব্দুল্লাহ বিন আমির রা: বলেন, “একদিন আমার মা আমাকে ডাকলেন, তখন আমাদের ঘরে নবীজীও স: ছিলেন। মা বললেন, এসো, তোমাকে একটা জিনিস দিব। রাসূলুল্লাহ স: তা শুনে বললেন, ‘আপনি কী দিতে চাচ্ছেন?’ মা বললেন, ‘আমি ওকে খেজুর দিতে চাচ্ছি’। নবীজী স: বললেন, (তাহলে ঠিক আছে।) কিন্তু যদি কিছু না দিতেন, তাহলে আপনার নামে একটা মিথ্যা কথা বলার পাপ লেখা হয়ে যেত।

روي عن عبد الله بن عامر رضي الله عنه قال : دعتني أمي يوماً ورسول الله صلى الله عليه وسلم قاعد في بيتنا فقالت: ها تعال أعطيك، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : "وما أردت أن تعطيه؟ " قالت : أعطيه تمراً، فقال لها رسول الله صلى الله عليه وسلم : "أما إنك لو لم تعطيه شيئا كتبت عليك كذبة"

৬. মানুষ হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা:

عن معاوية بن حيدة قال : سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول : ويل للذي يحدث بالحديث ليضحك به القوم فيكذب، ويل له، ويل له رواه الترمذي وقال : هذا حديث حسن، وأبو داود-

মুয়াবিয়া বিন হায়দা রা: বর্ণনা করেন, ‘আমি নবীজীকে স: বলতে শুনেছি, ‘তার ধ্বংস হোক, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। তার ধ্বংস হোক। তার ধ্বংস হোক। (তিরমিযী-২৩৫, আবু দাউদ-৪৯৯০)

মিথ্যার পরিণতি:

১. অন্তরে কপটতা সৃষ্টি হওয়া:

আল্লাহ তা’আলা বলেন,
فأعقبهم نفاقاً في قلوبهم إلى يوم يلقونه بما أخلفوا الله ما وعدوه وبما كانوا يكذبون

তারপর এরই পরিণতিতে তাদের অন্তরে কপটতা স্থান করে নিয়েছে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে গিয়ে মিলবে। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা লংঘণ করেছিল এবং এজন্যে যে, তারা মিথ্যা কথা বলতো। (৯:৭৭)

২. উচ্ছৃঙ্খলতা ও জাহান্নামের পথে নিয়ে যাওয়া:

عن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : " إن الصدق بر، وإن البر يهدي إلى الجنة ، وإن العبد ليتحرى الصدق حتى يكتب عند الله صدِّيقا ، وإن الكذب فجور ، وإن الفجور يهدي إلى النار ، وإن العبد ليتحرى الكذب حتى يكتب كذاباً ". رواه البخاري ومسلم

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ স: বলেছেন, নিশ্চয় সত্য হলো পূণ্য, আর তা জান্নাতের পথ দেখায়। মানুষ সত্য বলতে বলতে একদিন আল্লাহর কাছেও তার নাম সত্যবাদী হিসেবে লেখা হয়। অপরদিকে মিথ্যা হলো পাপ ও উচ্ছৃঙ্খলতা। মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর কাছেও তার নাম মিথ্যাবাদীরূপে লেখা হয়। (বুখারী-৫৭৪৩, মুসলিম-২৬০৭)

এছাড়া সামাজিক জীবনে মিথ্যার কী পরিণতি তা তো কারো অজানা নয়।

[চার]

এপ্রিল ফুলে যে শুধু মিথ্যার ছড়াছড়ি হয়, তা কিন্তু নয়। একে অপরকে ঠাট্টাচ্ছলে ধোঁকাও দেন অনেক। অথচ কুরআন ও হাদীস স্পষ্টভাবে মানুষকে ধোকা দিতে নিষেধ করে।

মুনাফিকদের চরিত্র চিত্রায়ণ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:

يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ

তারা আল্লাহ্ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকেই ধোঁকা দেয়, কিন্তু তারা তা অনুভব করতে পারে না। (২:৯)

হাদীসে আছে:
عن أبى هريرة. أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- مر على صبرة طعام فأدخل يده فيها فنالت أصابعه بللا فقال « ما هذا يا صاحب الطعام ». قال أصابته السماء يا رسول الله. قال « أفلا جعلته فوق الطعام كى يراه الناس من غش فليس منى ».

আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ স: তরকারীর একটি স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্তুপের ভেতরে হাত দিয়ে তিনি আদ্রতা অনুভব করেন। তিনি মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার’? মালিক বলল, “নবীজী, এটা বৃষ্টির পানি”। নবীজী স: বললেন, “তাহলে সেগুলো উপরে রাখতে! যেন মানুষ দেখে-শুনে কিনতে পারে। শোন, যে ধোকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়”। (মুসলিম:২৯৫, তিরমিযী:১৩১৫)

ইমাম তিরমিযী এই হাদীস উল্লেখ করে বলেন, এই হাদীস দিয়ে উলামায়ে কিরাম প্রমাণ করেন যে, কাউকে ধোকা দেওয়া হারাম।

[উপসংহার]

পরিশেষে কথা হলো, ইতিহাস যা-ই হোক না কেন, মিথ্যা বলা ও ধোকা দেওয়া কোনো মুসলমানের, বরং, কোনো সুস্থ মানুষেরই কাজ হতে পারে না। তা সিরিয়াসলি হোক বা ঠাট্টাচ্ছলে হোক।

অতএব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই এর থেকে বিরত থাকা উচিৎ। তাই আসুন সবাই এপ্রিল ফুলকে 'না' বলি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

-------------------------
১লা এপ্রিল ২০০৯, প্রথম আলো ব্লগ

মৃত্যু: দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে..

যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের মানুষের আচরণ, কথাবার্তা কেমন হয় কে জানে! তাদের দিনটা কীভাবে কাটে, রাতটা কীভাবে শেষ হয়; তাদের শিশুরা কীভাবে হাসে, কীভাবে কাঁদে; তাদের চিন্তা-চেতনা, মানসিকতায় কী রকম প্রভাব পড়ে –এসব কল্পনাও করতে পারি না। পারি না বললে বোধহয় ভুল হচ্ছে, বলি, পারতাম না।

প্রতিদিন পত্রিকাগুলোতে খবর পড়তাম, “এতজন শিশু মারা গেছে; এতজন আহত হয়েছে” ইত্যাদি ইত্যাদি। মনটা কখনো কাঁদত, আবার কখনো কোনো প্রতিক্রিয়াই হতো না। যে খবরটা দৈনিকই পড়ছি, শুনছি, তাতে কোনো প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথাও নয়। এসব খবর মন যেন সয়ে নেয়। মিছিল-মিটিং, নিন্দা জানানো, শোক প্রকাশ -যা হয়, প্রথম দিকে হয়। এরপর সব কষ্ট হারিয়ে যায়, না, বলি, বিদায় নেয়।

আমার প্রিয় জন্মভূমিতে গত ক’দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ হয় নি তবু যুদ্ধের স্বাদ ( ! ) পাইয়েছে। আতঙ্কের মাঝে কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে কাঁদতে হয়, শিখিয়েছে। আমি বুঝেছি তাদের কষ্ট, যারা সারা বছরই এর চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝে দিনাতিপাত করছে। যারা প্রতিটি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

মাত্র দু’দিনের ঘটনা, অথচ... কে ভালো, কে খারাপ; কে ঠিক করেছে, কে ভুল করেছে; তা জানি না, জানতে চাইও না। শুধু জানি, ‘ওরা’ আমার দেশের বড় ক্ষতি করে ফেলেছে। এই ‘ওরা’ কারা, তা-ও জানি না। জানি না তা কখনো জানতে পারব কি না।

আজ আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোন বিচার-বিশ্লেষণ করা নয়। আমি শুধু আল্লাহ তায়ালার তিনটি বাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি। তিনি বলেন,

১. তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই- যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান কর,তবুও। (নিসা:৭৮)

২. বলুন,তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন সেসব কর্ম,যা তোমরা করতে। (জুমুয়া:৮)

৩. প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (আম্বিয়া:৩৫)

মৃত্যু আমাদের জন্য অবধারিত। আমাদের ঘরের দরজায়ই সে উপস্থিত। যে কোনো সময়ে, যে কোনো ক্ষণে কিছু না বলেই হঠাৎ সে ঢুকে পড়বে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সহজেই বুঝা যায়।

অতএব সে ক্ষণটির জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। আল্লাহর বিধানগুলো মেনে চলে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, দু’আ করতে হবে। অন্যায়, অপরাধ পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মৃত্যু পরবর্তী জীবনই চিরস্থায়ী, আর পৃথিবীর এ জীবন ক্ষণস্থায়ী।

আমরা মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেদের যেভাবে প্রস্তুত করতে পারি:

১. কুরআন ও হাদীস বেশি বেশি পড়ে নিজেদের ঈমানকে (বিশ্বাস) মজবুত করে।
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক মতো আদায় করে।
৩. যাকাত ঠিক মতো আদায় করে।
৪. যে কোনো প্রকার অন্যায়/অপরাধ/গোনাহের কাজ পরিহার করে।
৫. কোনো গোনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে অনুনয়-বিনয় করে অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
৬. কাউকে কোনো রকম কষ্ট না দিয়ে।
৭. কারো অধিকার/হক ক্ষুন্ন না করে।
৮. মা-বাবার দু’আ নিয়ে, তাদের সেবা করে।
৯. মৃত্যুর পর দু’আ করবে এমন সন্তান রেখে গিয়ে।
১০. মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়া যাবে –এ ধরনের জনসেবামূলক/সাদাকায়ে জারিয়া করে।

ইত্যাদি ইত্যাদি। এক কথায় বলা যায়, আল্লাহর বিধি-নিষেধগুলো সঠিকভাবে মেনে চলে। আল্লাহ আমাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দিন। আমীন।

----------------------
৬ই মার্চ ২০০৯, প্রথম আলো ব্লগ

একুশের কথা: ভাষার গুরুত্ব সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালাই দিয়েছেন


সিস্টেম যিনি তৈরি করেন, বানান, তিনিই সে সিস্টেম সম্পর্কে বেশি অবগত হন। সিস্টেমের সমস্যা, তার সমাধান, তার ব্যবহার-চরিত্র ইত্যাদি তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।

রোবটের কথাই ধরুন। কোন্ রোবটটা কীভাবে হাঁটবে, কীভাবে নাচবে, গাইবে, কথা বলবে –এ সব কিছুই সে রোবটের নির্মাতা জানেন। এমনকি রোবটটার কী কী অসুবিধা হতে পারে সেগুলোও তার জানা আছে। এরপর সেসবের সমাধানও তার কাছে থাকে।

আমরা মানুষ রূপী রোবট। কিংবা রোবট রূপী মানুষ। কিংবা দুটোই। আমাদেরও একজন নির্মাতা আছেন, স্রষ্টা আছেন। আমাদের শরীর নামক সিস্টেমটা তিনি বানিয়েছেন। এই সিস্টেমের রুচি, অরুচি, সমস্যা, সমাধান, চরিত্র, ব্যবহার, অনুভূতি, চাহিদা, প্রয়োজন ইত্যাদি সবই তিনি জানেন।

ভাষা আমাদের এ মানব-সিস্টেমটির অতীব প্রয়োজন। কারণ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ না হয়ে সে চলতে পারে না। একে অপরের সাথে মিলে মিশে তাকে থাকতেই হয়। আর এজন্যে তার প্রয়োজন হয় ভাব প্রকাশের, ভাব আদান প্রদানের। ভাষা সে কাজটিই করে।

আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা তা ভালো করেই জানেন। মানুষের চাহিদা পূরণে তিনি সবসময় ব্যস্ত। মানুষ তাঁকে যতটুকু স্মরণ করে, তিনি তার চেয়ে বেশি তাদেরকে কাছে টেনে নেন, তাদের কথা শোনেন। এরপর সময় মতো তিনি মানুষের জন্য যেটা কল্যাণকর হয়, সেটা করে দেন। আবার কিছু জমিয়েও রাখেন, শেষ প্রহরে ক্বিয়ামতের দিন তাদের সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য।

মানুষের এই চাহিদাটুকু বুঝেই আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে মানুষের কাছে তাঁর প্রতিনিধি -নবী -পাঠিয়েছেন স্বগোত্রীয় ভাষা দিয়ে। যাকে যাদের কাছে পাঠাতেন, তিনি তাদের ভাষাতেই কথা বলতেন। তাদের ভাষায়ই তিনি হাসতেন, কাঁদতেন।

এভাবে প্রত্যেক গোত্রের কাছে তাঁর ঐশী গ্রন্থও পাঠিয়েছেন তিনি তাদেরই ভাষাতে। তিনি বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
“আমি সব রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি,যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে। (১৪:৪)”

এভাবে তাঁর শেষ নবী মুহাম্মদকে স: আরবের লোকদের কাছে পাঠিয়েছেন বলে কুরআনও তাঁর উপর আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছেন। তিনি বলেন,

১. إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
“আমি একে আরবি ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি,যাতে তোমরা বুঝতে পার। (১২:২)(৪৩:৩)”

২. وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَىٰ وَمَنْ حَوْلَهَا
“এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবি ভাষায় কোরআন নাযিল করেছি,যাতে আপনি মক্কা ও তার আশ-পাশের লোকদের সতর্ক করেন। (৪২:৭)”

৩. وَكَذَٰلِكَ أَنْزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا وَصَرَّفْنَا فِيهِ مِنَ الْوَعِيدِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ أَوْ يُحْدِثُ لَهُمْ ذِكْرًا
“এমনিভাবে আমি আরবি ভাষায় কোরআন নাযিল করেছি এবং এতে নানাভাবে সতর্কবানী ব্যক্ত করেছি,যাতে তারা আল্লাহ্ভীরু হয় অথবা তাদের অন্তরে চিন্তার খোরাক যোগায়। (২০:১১৩)”

তিনি আরো বলেন,
৪. فَإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الْمُتَّقِينَ وَتُنْذِرَ بِهِ قَوْمًا لُدًّا
“আমি কোরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি,যাতে আপনি এর দ্বারা পরহেযগারদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। (১৯:৯৭)”

৫. َإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
“আমি আপনার ভাষায় কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি,যাতে তারা স্মরণ রাখে। (৪৪:৫৮)”

আরবদের মাতৃভাষা আরবীতে কুরআন অবতীর্ণ না হলে তারা তা বুঝতে পারত না, সংশয় পোষণ করত। তা বুঝেই আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ ۖ أَأَعْجَمِيٌّ وَعَرَبِيٌّ ۗ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ ۖ وَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ فِي آذَانِهِمْ وَقْرٌ وَهُوَ عَلَيْهِمْ عَمًى
“আমি যদি একে অনারব ভাষায় কোরআন করতাম,তবে অবশ্যই তারা বলত,এর আয়াতসমূহ পরিষ্কার ভাষায় বিবৃত হয়নি কেন? কি আশ্চর্য যে, কিতাব অনারব ভাষার আর রসূল আরবী ভাষী। বলুন,এটা বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রোগের প্রতিকার। যারা মুমিন নয়,তাদের কানে আছে ছিপি,আর কোরআন তাদের জন্যে অন্ধত্ব। (৪১:৪৪)”

সারকথা, মানুষের ভাষার গুরুত্ব সর্বপ্রথম মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালাই দিয়েছেন। প্রত্যেক জাতির কাছে তাঁর নবী ও বাণী পাঠিয়েছেন তাদেরই ভাষায়। অতএব প্রত্যেকের কাছে নিজ ভাষা অবশ্যই স্রষ্টা প্রদত্ত গুরুত্ব বহন করে। তা অবহেলা করার বা ভুলে থাকার কোন সুযোগ নেই।

তাই আসুন, আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। একে অবিকৃত রাখার চেষ্টা করি। এর মাধ্যমে অন্যায়-অনাচার না করে একে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের প্রীতি-সম্প্রীতি ও ভালবাসার মাধ্যম বানাই। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।

ছবি: নেট থেকে নিয়ে সম্পাদনাকৃত।

----------------------------
প্রথম প্রকাশ: ২১শে ফেব্রুয়ারী

সুদি লেনদেনই অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ: বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে বিচারপতি তাকি উসমানি

সুদি লেনদেনই বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ। সুদমুক্ত লেনদেনে কখনও এ ধরনের মন্দা আসতে পারে না। বর্তমান বিশ্বে সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকগুলোই তূলনামূলক ভাবে মন্দার দেখা কম পেয়েছে।

গত ১৫ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ ‘বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের’ বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলিম-উলামাদের জন্য আয়োজিত ‘ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতি’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্টের শরিয়াহ আপিলেট বেঞ্চের সাবেক বিচারপতি, ওআইসির ইসলামি ফিকাহ একাডেমির স্থায়ী সদস্য, বিশিষ্ট ইসলামিক অর্থনীতিবিদ মুফতি তাকি উসমানি এ কথাগুলো বলেছেন।

এর আগে গত ১৪ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯ ঢাকা শেরাটন হোটেলে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডারড্ চাটার্ড ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ড কর্তৃক আয়োজিত ‘ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতি’ বিষয়ক সেমিনারেও তিনি এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন। সেখানে দেশের খ্যাতনামা তিন শতাধিক ব্যাংকার, শরীয়াহ স্কলার, প্রফেসর, বুদ্ধিজীবি ও ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিলেন।

বসুন্ধরায় তাঁর প্রদত্ত বক্তব্যের সারকথাটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা সুদের ব্যাপারে কুর’আন কারীমে বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ

“হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে,তা পরিত্যাগ কর,যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর,তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও”। (২:২৭৮-২৭৯)

আর কোনও পাপের ক্ষেত্রে এত ভয়াবহ ঘোষণা আল্লাহ দেননি। হাদীসে আছে,

الربا سبعون بابا أدناها كالذي يقع على أمه “সুদের প্রকার সত্তরটির মতো। সর্বনিম্নটির উদাহরণ ঐ ব্যক্তির মতো, যে তার নিজ মায়ের সাথে অপকর্ম করে”। (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, কিতাবুল বুয়ু:২৮৪৭, আলবানী বলেন: সহীহ লিগাইরিহী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব লিল আলবানী:১৮৫৩)

বিগত পাঁচশ বছর ধরে এই ভয়াবহ পাপের মাঝে সারা বিশ্ব ডুবে আছে। ইহুদীদের চক্রান্তে তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আজ কেউ এর বাইরে নয়। আর এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, পুরো পৃথিবী এখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স. বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

যুগে যুগে এই ভয়াবহ রোগটি মানুষকে এমন ভাবে আক্রান্ত করেছে যে, সোশালিজম বলুন আর অন্য যা-ই বলুন, কেউ এর থেকে বের হতে পারেনি।

এদিকে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকায় তাদের জ্ঞান-আহরণ ও বিতরণ সব মসজিদ ও মাদ্রাসা কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। গবেষণা-ফাতওয়া কেবল ইবাদাত সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীতেই হয়েছে। অথচ ইসলাম যে মানুষকে ইবাদাত ছাড়াও ‘মু’আমালাত তথা লেনদেন’ -এর ক্ষেত্রেও দিচ্ছে পর্যাপ্ত দিক নির্দেশনা, তার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগই হয়নি, কিংবা বলা যায়, সুযোগ পাওয়াই যায়নি।

কিন্তু গত অর্ধশতাব্দী ধরে মুসলমান দেশগুলো ক্রমেই স্বাধীনতা লাভ করতে থাকলে, সে সময়, পারস্পারিক লেনদেন তথা মু’আমালাতকেও ইসলামীকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। যার ফলে মুসলিম দেশগুলোতে শুরু হয়ে যায় নতুন গবেষণা।

তবে এ ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় যে বাধাটি দাঁড়ায় তা হলো, সুদ। না, সুদ ছেড়ে বের হওয়া যাচ্ছিল না কোন ভাবেই। লেনদেনের সকল পর্যায়ে সুদ এমন ভাবে জাল বিস্তার করে রেখেছিল যে, তা থেকে বের হওয়া অসম্ভবই মনে হচ্ছিল।

ফলে একদল লোক তো বলেই উঠল, যে, ব্যাংকের সুদ আর প্রাচীন সুদের প্রেক্ষাপট এক নয়। প্রাচীন সুদ ছিল জমিদারী সুদের ন্যায়। যেখানে গ্রাহক ছিল দরিদ্র, আর দাতা ছিল ধনী। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। গ্রাহক ও দাতা উভয়ে এখন ধনী। সুদ এখন আর কারও গলা চেপে ধরে না। অতএব এই সুদ সেই সুদ নয়। এই সুদ নির্ভেজাল, হালাল।

এ প্রেক্ষিতে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। এক ভিনদেশী গায়ক একবার হজ্জ্ব করতে গেল। তো হজ্জ্বের মাঝে তার দেখা হলো এক আরবী গায়কের সাথে। ভালোই ভাব জমলো উভয়ের মাঝে। এক রাতে সেই আরবী গায়ক ভিনদেশী গায়ককে গান শোনাতে চাইল। সেও রাজী হলো। আরবী গায়ক গান শোনাল। সেটা গান হয়েছিল কি না কে জানে, তবে গায়ক খুব মজা করেই গেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শ্রোতা ভিনদেশি গায়কটা তাকে থামিয়ে বললো, থাম! এখন বুঝেছি কেন আরবের নবী মুহাম্মদ স. গান নিষিদ্ধ করেছিলেন! তোমাদের মতো সুকণ্ঠী ( ! ) গায়কদের গান শুনে বিরক্ত হয়েই তিনি এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। আমার গান শুনলে নিশ্চয় তিনি এমন বলতেন না।

তো ব্যাপারটা এমনই। সুদ তখন এক প্রেক্ষিতে নিষিদ্ধ হয়েছে, এখন প্রেক্ষিত পাল্টেছে, তাই সুদও আর হারাম নয়, এটা তাদের দাবী। কিন্তু প্রেক্ষিত তো অনেক পাপের ক্ষেত্রেই পাল্টেছে, তাই বলে কি সে সব পাপই হালাল হয়ে যাবে? না, কখনও না।

আলহাম্দুলিল্লাহ উলামায়ে হক্ক্ব –এর আহ্বানে এই সমস্যা সমাধান হয়। জেদ্দায় ৪৩টি দেশের ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত হন যে, প্রাচীন সুদ আর বর্তমান সুদ এর মাঝে কোনও পার্থক্য নেই।

আমি যখন প্রথম লেখালেখি করতাম, তখন সবাই বলত,সুদের একটি বিকল্প বের কর।শুধু হারাম বলে দিলে মানুষকে বিরত রাখা যাবে না। এর একটি বৈধ বিকল্প লাগবে।

দেখুন, কিছু বিষয় আছে এমন যার কোন বিকল্প হতে পারে না। যেমন ধরুন, জুয়া। এর কোন বৈধ বিকল্প হতে পারে না। কারণ এর মূল উদ্দেশ্যই হারাম।

আবার কিছু বিষয় এমন যার বিকল্প হতে পারে, যার উদ্দেশ্য তো বৈধ, কিন্তু পন্থাটি অবৈধ। যেমন ব্যাংক ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য তো ব্যবসা। আর তা হালাল। কিন্তু পন্থাটি সুদ ভিত্তিক। তাই তা অবৈধ।

দেখুন, ব্যবসার জন্য তো পুঁজি লাগেই। কিন্তু বর্তমান বাজারে একক পুঁজিতে ব্যবসা করা এক প্রকার অসম্ভব।

যেমন ধরুন, লোহার কথাই বলি। আল্লাহ কুরআন কারীমে লোহার কথা এভাবে বলেন,

وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ “আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার”। (হাদীদ, ৫৭:২৫) সত্যিই, লোহা প্রতি যুগেই অত্যন্ত লাভজনক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

কিন্তু এ যুগে কেউ যদি লোহার কোন কারখানা দিতে চায়, তার একার পক্ষে তো সম্ভব হবেই না, বরং পুরো দেশ মিলেও একটা লোহার কারখানা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই স্বভাবতই এখন হাজার মানুষের পুঁজিকে পুঁজি করে ব্যবসা করার কনসেপ্ট এসেছে।

আবার ঘরে অর্থ জমিয়ে রাখাও ইসলামের মেজাজ নয়। দেখুন আল্লাহ তায়ালা বলছেন,

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ

“আর যারা স্বর্ণ ও রূপা (ধন সম্পদ) জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে,তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও”। (৯:৩৪)

كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ “যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের হাতে পুঞ্জিভূত না হয়ে পড়ে। (৫৯:৭)

অতএব ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা হতেই পারে, এর প্রয়োজন আছেই। কিন্তু এর পন্থাটায় ত্রুটি ছিল। সেটি সুদযুক্ত হওয়ায় এর বৈধ বিকল্প বের করা উলামায়ে কিরামের দায়িত্ব ছিল।

সে লক্ষ্যে মুফতী শফী, মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরী প্রমুখ নিরলস চেষ্টা করে গিয়েছেন। ১৯৭৭ এর দিকে সর্বপ্রথম একটি ইসলামী কাউন্সিল গঠিত হয়, যার মাধ্যমে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা শুরু হয়। এরপর দারুল উলুমে ‘মাজলিসে তাহকীকে মাসায়েলে হাজেরা’ নামে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে কয়েকটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যাদের কাজ ছিল সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমি সাধারণত মুদারাবা ও শিরকত পদ্ধতিতে লেনদেন করতেই ব্যাংকগুলোকে বেশি পরামর্শ দিয়ে থাকি। অন্য পদ্ধতিতেও লেনদেন হতে পারে, আমি সেগুলোকে নাজায়েয বলি না, যদিও কেউ কেউ ভুল বুঝে তা মনে করে।

তবে এ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ইসলামে নির্দেশিত ‘বাঈ’ তথা কেনা-বেচার সব শর্ত যেন ঠিকমতো পাওয়া যায়। যেমন, মালিকানা > হস্তগত হওয়া > বিক্রয় করা। এর কোনটি যদি অনুপস্থিত থাকে তা হলে নিঃসন্দেহে তা অবৈধ হবে। যেমন মালিকানা না থাকলে ‘রিবহে মা লা ইয়াজমান’ আবশ্যক হয়, যা সুস্পষ্ট হারাম।

বর্তমান বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তা তিন কারণে হচ্ছে।

১. بيع الدين বা ঋণের বিনিময়ে বিক্রয়

২. بيع ما لا يملك বা মালিকানাহীন বস্তুর বিক্রয়

৩. بيع ما لم يقبض বা যা হস্তগত নয় তার বিক্রয়

তিনোটাই হারাম। আর হারামের অনিবার্য পরিণতি হলো ক্ষতি; মন্দা।

পশ্চিমের পত্রিকাগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই আর্টকেল ছাপা হয়, যে, ইসলামী ব্যাংগুলোতে মন্দার ছোঁয়া কম লেগেছে। নতুন নতুন ব্যাংকও এখন ইসলামী শাখা খুলতে সচেষ্ট হচ্ছে। এদিকে কিছু কিছু পত্রিকা আবার আমাকে জঙ্গি উপাধি দিচ্ছে। আমি না কি তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছি, তাই আমাকে দমন করার জন্য এ কৌশল।

অতএব, প্রিয় ভাইয়েরা!

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এ ব্যবস্থাটি বুঝুন। এতে ভুল থাকলে, তা কিছু থাকবেই, সংশোধনের জন্য চেষ্টা করুন। যত দিন না এতে যোগ্য লোকেরা অধিক সংখ্যায় যোগ দিচ্ছেন, ততদিন তা সম্পূর্ণ রূপে সঠিক কিভাবে হবে! কোন কিছু খারাপ মনে হলে পিছু না হটে তা শুধরানোর চেষ্টা করুন। আমাদের গোটা কয়েকজনের প্রচেষ্টায় তো শত শত বছরের ব্যবস্থা পাল্টে যাবে না। পাচ শ’ বছরের ব্যবস্থা পাল্টাতে তো কিছু সময় লাগবেই।

এরপর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব:

প্র: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ইসলামী ব্যাংকগুলোর লেনদেন কীভাবে হয়ে থাকে? সুদী লেনদেন হলে তো ইসলামী ব্যাংকগুলো সুদমুক্ত নয়। এ অবস্থায় লেনদেন করাটা কতটুকু হালাল হবে?

উ: আপনাদের দেশের অবস্থা তো জানি না। আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আলাদা বিভাগ আছে। যেখানে সুদমুক্ত লেনদেন হয়। অতএব তা হালাল হবে। (তখন ‘বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের’ পরিচালক মুফতী আব্দুর রহমান বললেন যে, আমাদের দেশেও এ রকম ব্যবস্থা করার জন্য আমরা আবেদন জানিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। আশা করি শীঘ্রই এ নিয়ে তারা সুন্দর পদক্ষেপ নিবেন।)

প্র: ইসলামী বীমাগুলোর ব্যাপারে আপনার কী মত?

উ: মালয়েশিয়ায় যে ইসলামী বীমা আমি দেখেছি, তা আমার মতে হালাল নয়। আমি সেটা তাদের বলেছি। অবশ্য সাউদীতে অনেকটা হালাল ভাবে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ দেশের অবস্থা আমার জানা নেই।

প্র: আজ ১৫ই ফেব্রুয়ারী আমাদের দেশের একটি জাতীয় দৈনিক ‘আমার দেশ’ –এ খবর এসেছে যে, আপনি বলেছেন, যে, এদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর লেনদেন ১০০% হালাল। আপনি কি আসলেই তা বলেছেন?

উ: না। কখনো নয়। আমি কোন ব্যাংকের ব্যাপারেই এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য করি না। যেসব ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডে আমি আছি, সেগুলোর ব্যাপারেই কেবল আমি সুনির্দিষ্ট মতামত জানাই, যেহেতু তাদের ব্যাপারে আমি জানি। আর বাকীগুলোর ক্ষেত্রে আমি বলি যে, যদি সেগুলো ইসলামী শর্ত মেনে পরিচালিত হয়, তবে হালাল। নতুবা হারাম।

আজকাল অনেক ইসলামী ব্যাংক-ই সুকৌশলে ইসলামী শর্তগুলো উপেক্ষা করে যাচ্ছে। আমি তাদের সুস্পষ্ট ভাবেই বলে দিই যে, তারা হারাম কাজ করে মানুষকে ধোকা দিচ্ছে। তবে এ জন্য আপনাদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আপনি দেখবেন যে, এ দেশে এবং পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ইসলামী ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই এমন যারা ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতি সম্বন্ধে গভীর পান্ডিত্য রাখেন না। তারা মনে করেন যে, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে একটু ঘুরিয়ে করলেই ইসলামী ব্যাংকিং হয়ে গেল। ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। বরং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, যেগুলো সঠিক ভাবে প্রয়োগের জন্য আপনাদের অংশগ্রহণ অধিকহারে কাম্য।

(উল্লেখ্য যে, ‘আমার দেশ’ –এর খবরটিতে সামান্য বিভ্রান্তি আছে। তবু সেখানে কিন্তু কেবল আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর কথা বলা হয়নি। অতএব প্রশ্নকর্তাও বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্ন করেছেন। 'আমার দেশের' নিউজটি পড়ুন এখানে। )

এরপর তিনি আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। সবশেষে আলিম উলামাদেরকে বৃহত্তর পরিসরে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে পড়া ও গবেষণা করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোর সিলেবাসে ইসলামী অর্থনীতি ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানান।

(পাঠকবৃন্দ, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে মুফতি তাকি উসমানির অর্থনীতি বিষয়ক বইগুলোর অনুবাদ গ্রন্থগুলো পড়তে পারেন। এ ছাড়া আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেবের ‘ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ণ’ পড়ে নিতে পারেন। বইগুলো যে কোন ইসলামিক লাইব্রেরীতেই পাওয়া যেতে পারে।)

--------------------
১৮ই ফেব্রুয়ারী ২০০৯

ভোট ও ভোটাধিকার – দেখুন ইসলাম কী বলে...

নির্বাচন ২০০৮। আর মাত্র একটি দিন বাকি। প্রার্থীদের শেষ প্রচারণাও শেষ হওয়ার পথে। অনেকেই ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন কাকে ভোট দিবেন। কেউ আবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। কেউ ভাবছেন, একজনকে দিলেই তো হয়; যার জেতার সম্ভাবনা বেশি তাকে দিলেই বরং ভালো, ভোটটা আর বেকার যায় না।

কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন যে, ভোট দেওয়া এক মহান দায়িত্ব। পরকালে এ ব্যাপারে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। সৎ প্রার্থীকে ভোট দিলে তো কথাই নেই। কিন্তু জেনে শুনে অসৎ প্রার্থীকে ভোট দিলে তার পরিণাম কী হবে?

ইসলাম ভোট ও ভোটাধিকারকে তিনটি প্রায় অভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে।

১. সাক্ষ্য প্রদান।
২. সুপারিশ করা।
৩. উকিল বানানো বা দায়িত্ব দেওয়া।

এবার একটু ব্যাখ্যা করা যাক...

১. সাক্ষ্য প্রদান: কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো তার ব্যাপারে এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, তিনি সৎ ও যোগ্য; দেশ ও জাতির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত।

কেউ সৎ ও যোগ্য না হলেও তাকে ভোট দেওয়া আর তার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া একই রকম। উভয়টাই মহাপাপ বরং হারাম। কুরআন ও হাদীসে এমন ভাষ্যই পাওয়া যায়।

আল্লাহ বলেন,

- “তোমরা মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিরত থাক”। (সূরা হাজ্জ্ব: ৩০)
- “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও”। (সূরা নিসা: ১৩৫)
- “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না”। (সূরা মায়েদা: ৮)

নবীজীও স: আমাদেরকে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান হতে সতর্ক করেছেন।

- হযরত আনাস রা: হতে বর্ণিত, নবীজীকে স: একবার কবীরা গোনাহ বা মহাপাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি উত্তরে বললেন, “আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, মানুষ হত্যা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (বুখারী: ২৫১০)
- আয়মান বিন আখরাম রা: বলেন, একদিন নবীজী স: খুতবায় দাঁড়িয়ে বললেন, “হে লোকসকল! মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া আর আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার একই রকম”। (তিরমিযী: ২২৯৯)

আবার যোগ্য কাউকে না পেয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকাও হারাম। কেননা ভোট না দেওয়া আর সাক্ষ্য গোপন করা একই রকম। আর আল্লাহ বলেন,

- “তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে”। (সূরা বাক্বারা: ২৮৩)

২. সুপারিশ করা: ভোট দেওয়ার অপর অর্থ হলো ভোটপ্রার্থীর জন্য এ মর্মে সুপারিশ করা যে, আমার দৃষ্টিতে তিনিই সবচেয়ে সৎ ও যোগ্য। অতএব, আমি তাকে নির্বাচিত করার সুপারিশ করছি।

আর জেনে শুনে অসৎ ব্যক্তির জন্য ভোট বা সুপারিশ করলে পরবর্তীকালে তার সব অসৎ কর্মকান্ডের বোঝা ভোটারের উপরও আসবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যে লোক সৎকাজের জন্য কোন সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দ কাজের জন্য সুপারিশ করবে, সে তার বোঝারও একটি অংশ পাবে”। (সূরা নিসা: ৮৫)

৩. উকিল বানানো বা দায়িত্ব দেওয়া: কাউকে ভোট দেওয়ার আরেক অর্থ হলো তাকে জাতির উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া এবং উকিল বানানো।

নিজ প্রয়োজনে কাউকে উকিল বানালে তো তার লাভ-ক্ষতি কেবল নিজের উপরই বর্তায়। কিন্তু কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ তাকে পুরো জাতির উকীল বানানো, যার লাভ-ক্ষতি সমগ্র জাতিকেই ভোগ করতে হয়। ফলে সমগ্র জাতির কাছে এই ভোটারকে অপরাধী হতে হয়। সে সাথে প্রার্থী জয়যুক্ত হয়ে অন্যায় ও দুর্নীতি করলে তার পাপের বোঝাও ভোট প্রদানকারীর উপর বর্তায়।

তো কী করা যেতে পারে? এ প্রশ্ন সবারই। আগে ‘না ভোট’ –এর ব্যবস্থা ছিল না। কোন একজনকে ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোন গত্যান্তর ছিল না তখন। তাই সে প্রেক্ষিতে অপেক্ষাকৃত কম খারাপ প্রার্থীকেই ভোট দেওয়া সঙ্গত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ‘না ভোট’ –এর ব্যবস্থা থাকায় সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে তা দেওয়াই সঙ্গত হবে।

সারকথা:

১. ভোটের ব্যাপারটা কেবল পার্থিব নয়। পরকালেও এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন দিতে হবে।
২. ভোট না দেওয়া হারাম। আবার অসৎ ও অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়াও হারাম। এ ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে অসৎ প্রার্থীর অসৎ কর্মকান্ডের পাপের ভাগী ভোটারকেও হতে হবে।
৩. দল-মত নির্বিশেষে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে হবে। এতে পরবর্তীকালে তিনি যা যা ভালো কাজ করবেন তার সওয়াব ভোটারও পাবেন।
৪. সৎ প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও তাকেই ভোট দিতে হবে। নতুবা এটি জেনে শুনে অন্যায়ের সাপোর্ট বলে গণ্য হবে।
৫. অসৎ প্রার্থীকে ভোট দেওয়া একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এ থেকে তাওবার সুযোগ দ্বিতীয়বার আর আসে না।
৬. কোন সৎ প্রার্থী না থাকলে নিজের দায়মুক্তির জন্য ‘না ভোট’ দেওয়াই শ্রেয়।

ভোট দেওয়ার আগে তাই ভেবে নিন আরেক বার...

---------------------
প্রথম প্রকাশ: ২৭শে ডিসেম্বর, প্রথম আলো ব্লগে

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে The Biggest International Islamic Concert in Bangladesh.


দু’ সপ্তাহ আগেই টিকেট শেষ। একে তো বাংলাদেশে এ যাবতকালে হওয়া সবচেয়ে বড় ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক কনসার্ট। দ্বিতীয়ত, ভেন্যু হল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। আর এর উদ্যোক্তা স্বয়ং বাংলাদেশের বড় বড় আলেমগণ। সব মিলিয়ে সকলের আগ্রহ অনেক বেশিই ছিল। শুনেছি অনেক জায়গায় নকল টিকেটও নাকি বিক্রি হয়েছে।

আমরা রওয়ানা করলাম দুপুর দুইটায়। শুরু হওয়ার কথা তিনটায়। বের হতে দেরি হয়ে গেল। এরপর রাস্তার নিয়মিত ট্রাফিক জ্যাম। আবার শুনেছিলাম, তিনটার পর কোন টিকেট গ্রহণ করা হবে না। টিকেটের মাঝে কোন সিরিয়াল নাম্বার ছিল না, তাই নকল ঠেকাতে হয়ত কর্তৃপক্ষের কাছে এছাড়া আর কোন পথও ছিল না। অর্থাৎ নকল টিকেটে কেউ যদি ঢুকেও যায়, তাহলে যাদের আসল টিকেট আছে তারা ভেতরে আসন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর আর ঢুকতে পারবেন না। এসব মিলিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম, যদি তিনটার বেশি বেজে যায়.. যদি ঢুকতে না পারি..

যাহোক, আমরা আলহামদুলিল্লাহ তিনটা বাজার ৩ মিনিট আগেই পৌঁছুলাম। কিন্তু একি দেখি.. ভেতরে ঢুকার বিশাল লাইন। যারা গতকাল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে কম্পিউটার মেলায় গিয়েছেন তারা হয়ত দেখেছেন ব্যাপারটা। শুধু হুযুর আর হুযুর। ঢুকতে ঢুকতেই ৪ টা বেজে গেল। প্রথম বলে কিছু মিস্ ম্যানেজমেন্ট ছিল। তাই আর তিনটায় শুরু করা যায়নি। ভেতরে ঢুকার কিছুক্ষণ পরই ঘোষণা শোনা গেল, “আসরের আযান হয়ে গিয়েছে। তাই চলুন আমরা নামায পড়ে নিই। আমাদের এই হলের সামনের ডান ও বাম দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আরেকটা হল আছে যেখানে এক সাথে পাঁচশত জন নামায পড়তে পারে। সেখানে চলে যান। নামাযের পর সকলেই আবার নিজ নিজ স্থানে এসে বসবেন”। আবার একটা হিউম্যান জ্যাম লাগল। এত্তগুলা মানুষ একসাথে যখন একটা গেটের দিকে এগিয়ে যায় তখন কি অবস্থা হয় ভাবুন। যাহোক, সেখানে একটা রুম খুলে দেয়া হল আমাদের নামাযের জন্য। যথারীতি ইকামত.. নামায। এরপর আবার স্ব স্ব স্থানে ফিরে আসলাম। এবার কোন গন্ডগোল হল না।

এ অনুষ্ঠানটি ‘কলরব শিল্পীগোষ্ঠী’ ও ‘ইকরা বাংলাদেশ’ এর যৌথ প্রযোজনা। কলরব হল বাংলাদের নামকরা ইসলামী সংগীতশিল্পী ‘আইনুদ্দীন আল আজাদ’ –এর প্রতিষ্ঠান। আর ইকরা বাংলাদেশ হল মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে এক স্কুল যার প্রায় বিশটিরও বেশি শাখা আছে সারা বাংলাদেশে। ঢাকার চৌধুরীপাড়ায় এর মূল শাখা। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ পাকিস্তানের ‘জুনাইদ জামশেদ’। ১৯৮৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত যিনি পাকিস্তানের অন্যতম ফেমাস পপ সিঙ্গার, ২০০২ থেকে অদ্যবিধি তিনিই একজন ফেমাস ইসলামী সংগীতশিল্পী। তাবলীগের ছোঁয়ায় তার জীবন ঘুরে গিয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেটার সাঈদ আন্‌ওয়ার, সাকলাইন মুশতাক তার তাবলীগী সাথী। এছাড়াও অন্যান্য শিল্পীদের মাঝে আছেন ইংল্যান্ডের ইকবাল আনোয়ার ও ভারতের আহমাদ আব্দুল্লাহ। আর আমাদের আইনুদ্দীন আজাদ ও তার কলরবের শিশু শিল্পীরা তো আছেনই। অনুষ্ঠানটির স্লোগান ছিল, "বিশ্ব শান্তির প্রত্যাশায়.. for global peace.."

নামায থেকে আসার কিছুক্ষণ পরই আইনুদ্দীনের কণ্ঠ শোনা গেল, “আপনারা সবাই সুশৃঙ্খলভাবে বসে পড়ুন। আমাদের অনুষ্ঠান এখনই শুরু হতে যাচ্ছে। আমি মাইক ছেড়ে দিচ্ছি আজকের দুই উপস্থাকের হাতে। একজন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদপাঠক, (তার নামটি একটুও মনে করতে পারছি না।) অপরজন রেডিও টুডে’র আর.জে নীরব”। রেডিও টুডে অনুষ্ঠানটির মিডিয়া পার্টনার। এছাড়াও আছে ইসলামী টিভি, দৈনিক ইনকিলাব ও আমার দেশ। অনুষ্ঠান শুরু হল ইকরা বাংলাদেশের এক শিশুর কণ্ঠে কুরআন পাকের তিলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর মাগরীবের আযানের আগ পর্যন্ত চলল কলরবের শিশু শিল্পীদের হৃদয় ছোঁয়া হামদ ও নাত। এর মধ্যেই প্রথম সারিতে এসে বসলেন জুনাইদ জামশেদ ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। মাগরিব নামাযের বিরতির ঘোষণা দিলেন আর.জে নীরব। আবারও জ্যাম লাগল গেটে। এদিকে অনেকে জুনাইদ জামশেদের সাথে হাত মিলালো। আমিও সুযোগটা নিলাম। বললাম, “আপ সে ‘মিঠা মিঠা পেয়ারা পেয়ারা মেরে মুহাম্মদ কা নাম’ পাহলে সুননা চাহেঙ্গে”। তিনি উত্তর দিলেন, “হা জি? চালো সুনা দেঙ্গে.. (মুচকি হাসি)”। বড় বড় উলামায়ে কিরাম যারা ছিলেন তারা স্টেজেই জামাত করলেন। আমিও সুযোগটা নিলাম। ফলে আর অন্য রুমে যেতে হল না।


নামায শেষে এবার লাগল হুলস্থুল। এবার কেউ তার আগের জায়গায় নেই। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসায় আমার আগের সিটটা পেলেও অন্য অনেকেই তা আর পায়নি। ফলে.. অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ঘটে গেল এরই মধ্যে। তবে ভলান্টিয়ার ভাইদের সহযোগিতায় সবকিছু আবার নিয়ন্ত্রণে চলে আসল।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে এখন। প্রথমে কুরআন পাকের তিলাওয়াত হল। এরপর ইকরা বাংলাদেশের প্রধান পরিচালক আল্লামা ফরিদুদ্দীন মাস’উদ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। তাঁর বক্তব্যে এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “অতীতেও এটা প্রমাণীত যে, যেখানেই কোন ফিতনা-ফাসাদ শুরু হয়, সেখানে যদি আল্লাহর জিকির, হামদ ও তার নবীর (সাঃ) উপর প্রশংসা-দুরুদ পাঠ করা হয়, তাহলে আল্লাহ সেখানে রহমত নাজিল করেন। আজ আমাদের দেশ যে ক্রান্তিলগ্ন পার করছে, যে ফিতনা আমাদেরকে গ্রাস করছে, আশা করছি এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের উপর রহমত নাজিল করবেন। আল্লাহ এই অনুষ্ঠানের আয়োজকবৃন্দ ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং আজকের সকল উপস্থিতিকে কবুল করুন। আমীন।”

এরপর তিনি সকল বিদেশি শিল্পী ও অতিথিদের মঞ্চে আসতে অনুরোধ করলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার সাথে। একে একে.. জুনাইদ জামশেদ, পাকিস্তান। ইকবাল আনোয়ার, ইংল্যান্ড। আহমেদ আব্দুল্লাহ, ভারত। ইরফান সাঙ্গে, ইংল্যান্ড। হানীফ দুদওয়ালা, ইংল্যান্ড। মাও: আলী আল ফালাহী, ইংল্যান্ড। কায়কোবাদ, সাবেক ধর্মমন্ত্রী, গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকার..

তারপর ইংল্যান্ডের মাও: আলী আল ফালাহী সংক্ষেপে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ভালবাসার উপর একটা চমৎকার বক্তব্য দিলেন। বিশ্বাস করুন, আমার শুনা আমার জীবনে সবচেয়ে সুন্দর বক্তব্য। এত সুন্দর উপস্থাপনা, এত সুন্দর উচ্চারণ, সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়ের এত গভীর থেকে, এত আবেগ দিয়ে.. যেন ক্ষণিকের জন্য আমরা সবাই রাসুলুল্লাহর (সঃ) যুগে চলে গিয়েছিলাম। যেখানে সাহাবায়ে কিরামের মত আমাদের হৃদয়েও রয়েছে নবীজীর (সাঃ) প্রতি অগাধ ও নিখাদ ভালবাসা।

এরপর আইনুদ্দীন মঞ্চে আসলেন। তার পুরোনো তিনটি গান শোনালেন। আইন, কি জবাব দিবি রে তুই আল্লাহরই কাছে আর স্বাধীনতা। তিনি বললেন, বর্তমানে উলঙ্গ ও অর্ধালোঙ্গ নাচকেই সংস্কৃতি ভাবা হচ্ছে। অথচ তা হচ্ছে অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি আর উলঙ্গপনা এক হয় কিভাবে?

এরপর ভারতের আহমাদ আব্দুল্লাহ ও ইংল্যান্ডের ইকবাল আনোয়ার একটি একটি করে হামদ-নাত গেয়ে শুনালেন।

এবার মঞ্চে আসলেন বহু প্রতীক্ষীত জুনাইদ জামশেদ। তিনি শুরুতেই বললেন, এখন হজ্জ্বের মাস। সবাই মক্কা যাচ্ছে। মদীনা যাচ্ছে। কত খুশী তাদের। চলুন আমরাও মদীনা যাই। গাইলেন “ইয়ে সুবহে মাদীনা, ইয়া শামে মাদীনা.. মুবারাক তুঝে ইয়ে ক্বায়ামে মাদীনা.. মাদীনা মাদীনা”। আমরাও তার সাথে গাইলাম। মদীনায় পৌঁছে গেছি। মসজিদে নববীর মিনার দেখতে পাচ্ছি। আহ, সে যে কি শান্তি। না গিয়ে বুঝা যাবে না। একটু পর নবীজীর (সাঃ) রওজা মোবারকে যাব। সেখানে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে নবীজী (সাঃ) সরাসরি শুনবেন। গাইলেন "মুহাম্মাদ কা রাওজা কারীব আ রাহা হ্যায়, বুলান্দি পে আপনা নাসীব আ রাহা হ্যায়.. ফেরিশতো ইয়ে দে দো পায়গাম উন কো, খাবার যাকে দে দো উন কো ফেরিশতো, কে খাদিম তুমহারা সাঈদ আ রাহা হ্যায়..” আহ.. এত আবেগ দিয়ে.. হৃদয়ের এত ভেতর থেকে.. চোখে পানি এসেই পড়ল..

এবার আমরা মদীনায়। মদীনার আকাশ বাতাস সব জায়গায় প্রিয় নাম। মুহাম্মাদ (সাঃ)। এ অনুভূতি স্বর্গীয় অনুভূতি। গাইলেন “মিঠা মিঠা পেয়ারা পেয়ারা মেরে মুহাম্মাদ কা নাম, হাম সাব ভেজে উন পে হাজারো লাখো দুরুদ সালাম...” আমরাও সঙ্গে সঙ্গে গাইলাম..

এরপর আরো কয়েকটা হামদ-নাত গাইলেন। সবচেয়ে মজা হল যখন তিনি একটা বাংলা নাত গেয়ে শুনালেন। এটা নাকি তার এক বাঙ্গালী বন্ধু শিখিয়েছেন। “নবী মোর পরশমনি, নবী মোর সোনার খনি..” আর.জে নীরবও আর নীরব থাকতে পারলেন না। অসাধারাণ.. সত্যিই অসাধারণ.. বলে উঠলেন তিনি। সত্যি। এই “নবী মোর পরশমনি” যেন শুধু তার কণ্ঠেই মানায়। আহ... আবার চোখে পানি.. সত্যিই আমরা মদিনায়..

এরই মাঝে ফাকে ফাকে জুনাইদ জামশেদ কিছু কথা বললেন। নিজের জীবনের কথা, পরিবর্তনের কথা ইত্যাদি। দর্শক সারি থেকে হঠাৎ হঠাৎ-ই তাকবীর ধ্বনি ভেসে আসল। আর জুনাইদ জামশেদ বলছেন, “দোস্তো! ইয়াকীন মানো। হাম নে বহত সারে মেহফিল কী। বহত সারে মেহফিল দেখেঁ। লেকিন আজ যেয়সে ইতনা রওনাক অর শানদার অর বাড়ে মেহফিল মেয়নে কাভি নেহি দেখা। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ..” হাহা.. তিনি খুবই রসিক মানুষ। আবার বললেন, “দেখো.. ইয়ে দ্বীন ভি কিতনা আজীব হ্যায়। সাব কো এক কার দেতা হ্যায়। বাংলাদেশী, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, আমরিকান.. সাব কো ভাই ভাই বানা দেতা হায়।”

আরেকটি মূল্যবান কথা বললেন তিনি। “ভাই, আজ ইয়াহা আনেকা মাকসাদ কেয়া হ্যায় জানতে হো? ওয়াদা কারো কে আজ কে বা’দ কাভি গানা নেহি সুনেঙ্গে। দোস্তো, ইয়ে গানা তো হামারা নেহি হ্যায়। হামারা তো হ্যায় ক্বিরাত, হামদ অর নাত।” সবাই হাত তুলে ওয়াদা করল। তিনি বললেন, “আল্লাহ তুমকো জাযায়ের খাইর দে”।

এরপর তিনি আল্লাহর কাছে মুনাজাতের জন্য গাইলেন, “ইলাহী তেরে দার পার ম্যায় ভিখারী বান কে আয়া হু”.. আহ.. প্রতিটা গানই তিনি এত ভেতর থেকে গাইলেন.. এটা লিখে বুঝানো যাবে না।

তার উঠে যাওয়ার পর আবার আসলেন আইনুদ্দীন। তিনি কিছুক্ষণ মাতিয়ে রাখলেন দর্শকদের। “কি হবে বেঁচে থেকে” সহ আরো কয়টি গান গেয়ে।

এবার একে একে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর শিশুশিল্পীরা আসল। প্রথমে সম্মিলিত কণ্ঠে “ইয়া সাইয়্যিদি” গাইল। এত ছোট ছোট বাচ্চা আর এত সুন্দর কণ্ঠ.. মাশা’আল্লাহ। কলরবের অন্যতম প্রসিদ্ধ শিল্পী ‘আবু রাইহান’ তার ‘খাচার ভিতর অচিন পাখি’ ও আরেকটি গান গাইল। এছাড়া দাউদ আনাম, আহমাদ আব্দুর রহীম পৃথকভাবে গাইল। আর কয়েকটি সম্মিলিত কণ্ঠের হামদ-নাত তো ছিলই।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আরেকটি আকর্ষণ ছিল, পাঁচ-ছয় বছরের ছোট্ট এক শিশুর কণ্ঠে অসাধারণ এক নাত্। ইকরা বাংলাদেশের ছাত্রী হবে হয়ত।

সবশেষে সম্মিলিত কণ্ঠে একটা দেশাত্মবোধক গান হল। “আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ”। ঘড়ির কাটায় তখন নয়টা। আইনুদ্দীন মাইক হাতে মঞ্চে আসলেন। “নয়টার সময় আমাদের হল ছেড়ে দেয়ার কথা। তাই অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমাদের এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আপনার লক্ষ্য করেছেন যে, বিদেশি শিল্পীদের অতিরিক্ত সময় নেয়ায় আমাদের কলরবের অনেক আয়োজন বাদ দিতে হয়েছে। আমরা দুঃখিত। যা কিছু সফলতা সব আপনাদের। আর যা কিছু ব্যর্থতা সব আমার, আমাদের। ইনশা’আল্লাহ সামনে আরো বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে। স্টেডিয়াম ভাড়া নেয়ার ইচ্ছা আছে। দু’আ করবেন”।

এদিকে আর.জে নীরবের অদৃশ্য উপস্থাপনায় অনেকেই মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখার জন্য ছুটে গেছে। কিন্তু হায়.. সকলে সরব হওয়ার আগেই নীরবে নীরব সরে পড়েছেন।

যারা গতকালের এই অনুষ্ঠানটি মিস করেছেন তারা নিঃসন্দেহে একটা বড় মিস করেছেন। অবশ্য তাদের কথা স্মরণে রেখেই কর্তৃপক্ষ পুরো অনুষ্ঠানটির ভি.সি.ডি/ ডি.ভি.ডি দু’সপ্তাহের মাঝে বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া ইসলামী টিভি তো থাকছেই। মাঝে মাঝে প্রচার করতে পারে।

আমি অনুষ্ঠানটির কথা আগে বলিনি তাই আমাকে দোষারোপ করবেন না কিন্তু। আমি নিজেই কষ্ট করে টিকেট পেয়েছি। ২০০, ৫০০, ১০০০, ৫০০০ টাকার সব টিকেটই শেষ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। তবে হ্যাঁ, সামনে আবার এমন মাহফিল হলে আপনাদের অবশ্যই জানাব কথা দিচ্ছি।

Note: জুনাইদ জামশেদের প্রতিটা গানের সাথে তার লিংক দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া তার সকল ইসলামী গানের জন্য ক্লিক করুন এখানে। জুনাইদ জামশেদের জীবন কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে তা তার নিজ মুখে শুনুন এখানে। আর আইনুদ্দীন আজাদ ও কলরব শিল্পীদের গানের কোন লিংক নেই আমার কাছে। তবে যারা দেশে থাকেন, তারা সহজেই এসব পেতে পারেন বায়তুল মুকাররমে বা ইসলামী ক্যাসেট দোকানগুলোতে।

----------------------------

প্রথম প্রকাশ: ২১শে নভেম্বর ২০০৮, প্রথম আলো ব্লগে

"ওরা বাউল ভাঙল, বলাকা ভাঙল; চেয়ে চেয়ে দেখলাম।" - সাম্প্রতিক ভাস্কর্য ইস্যুকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী পর্যালোচনা

ওরা বাউল ভাঙল, বলাকা ভাঙল; চেয়ে চেয়ে দেখলাম। বিক্ষোভ চলেছে, অনশন হয়েছে, আমি দেখেই যাচ্ছি। আমার কি-ই বা করার আছে। কবিরা কবিতা লিখছে, লেখকরা প্রবন্ধ রচনা করছে, আমি নীরবে পড়ছি; আমার কি-ই বা লেখার আছে। কিন্তু এ সুযোগে কিছু ইসলাম বিদ্বেষী যে পুরো ইসলামকেই কটাক্ষ করছে; ইসলাম পড়ুয়াদের ঢালাওভাবে জঙ্গী বলছে, সন্ত্রাস বলছে; আমার কি সত্যিই কিছু বলার নেই? আমি কাঁদছি। চোখ দুটো ভিজে যাচ্ছে। আজ নবীজী স: থাকলে এমন কিছু নিশ্চয় ঘটত না। এসব অবুঝরা ইসলামকে না জেনে না বুঝে এভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারত না। আর এসব বুদ্ধিজীবিরাও ইসলামের অপব্যাখ্যা করতে পারত না।

আমরা মুসলিম। আমাদের ধর্ম ইসলাম। আমাদের প্রভুর খুব সুন্দর একটি নাম সালাম। আমাদের পরস্পরের অভিবাদন সালাম। মুসলিম, ইসলাম, সালাম –প্রতিটিরই শব্দমূল سلم যার অর্থ শান্তি। যে ধর্মের নাম ‘শান্তি’, প্রভু ‘শান্তি’, তার অনুসারীরা ‘শান্তি’, পরস্পরের অভিবাদন ‘শান্তি’, সে ধর্ম কি সত্যিই এত অশান্তির শিক্ষা দেয়? আর সেই শান্তি ধর্মে দীক্ষিত শান্তি কর্মীরাই বা কিভাবে এত অশান্ত হতে পারে? এসব প্রশ্ন আমাকে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। অবশেষে আজ লিখতে বসা।

গত ক’দিনের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগ পড়ে মনে হল, আমাদের মাঝে দু’ধরনের চিন্তাধারা কাজ করছে।
১. মূর্তি ও ভাস্কর্য ইসলামে বৈধ।
২. মূর্তি ও ভাস্কর্য ইসলামে বৈধ না। কাজেই দেশে যেসব ভাস্কর্য আছে সেসব ভেঙে ফেলতে হবে।

উল্লেখ্য যে, দুটো চিন্তাধারাই বিভ্রান্তিকর। তাই দুটো বিষয়েই ক্লিয়ার কাট আলোচনা করা হচ্ছে।

মূর্তি ও ভাস্কর্যের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান:

পাঠকবৃন্দ, প্রথমে নিম্নের আয়াত ও সহীহ হাদীসগুলোর উপর নজর বুলিয়ে নিন।

১. “তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা হতে বেঁচে থাক”। (সূরা হাজ্জ্ব:৩০)

২. আমর বিন আবাসা রা: বর্ণনা করেন, নবী স: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে। (মুসলিম:৮৩২)

৩. আব্দুল্লাহ বিন উমর রা: বলেন, নবী স: বলেছেন, “এই সব প্রতিকৃতির শিল্পীদের খুব শাস্তি দেয়া হবে। বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও তো।” (বুখারী:২য় খন্ড, পৃ:৮৮০, মুসলিম:২য় খন্ড, পৃ:২০১, রশীদীয়া লাইব্রেরী দিল্লী) (বুখারী:৫৯৫১, মুসলিম:২১০৭)

৪. ইবনে আব্বাস রা: বলেন, আমি নবীজী স: কে বলতে শুনেছি যে, “যে কেউ দুনিয়াতে কোন প্রতিকৃতি তৈরি করবে তাকে কিয়ামতের দিন বাধ্য করা হবে যেন সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে, অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না।” (বুখারী:৫৯৬৩, মুসলিম:২১১০)

৫. আবু হুরায়রা রা: বলেন, “আমি নবীজীকে স: বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তার চেয়ে জালিম আর কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির ন্যায় কিছু সৃষ্টি করে? পারলে একটি শস্য দানা বা একটি গম বা একটি যব সৃষ্টি করুক তো..।” (বুখারী:২:৮৮০, মুসলিম:২:২০২) (বুখারী:৫৯৫৩, মুসলিম:২১১১)

৬. আয়েশা রা: বলেন, “নবী স: ঘরে কোন ছবি-মূর্তি কিছু পেলে ছাড়তেন না, বরং তা সাথে সাথে ভেঙে ফেলতেন বা নষ্ট করে ফেলতেন।” (বুখারী:২:৮৮০,আবু দাউদ)

৭. আয়েশা রা: বলেন, “একবার তিনি একটা চাদর ক্রয় করেন, যাতে কিছু প্রাণীর ছবি ছিল। নবী স: তা দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ভিতরেও প্রবেশ করলেন না। আয়েশা রা: তাঁর চেহারায় ক্রোধের ছায়া দেখতে পেয়ে বললেন, নবীজী! আমার অপরাধ? নবী স: গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এ চাদরটি কেন? তিনি বললেন, এটা আমি আপনার জন্য কিনেছি। আপনি এতে বসবেন, শুবেন। নবী স: শুনে বললেন, কিয়ামতের দিন এসব প্রতিকৃতি ওয়ালাদের খুব শাস্তি দেয়া হবে। বলা হবে, এতে প্রাণ দাও। আর তা কখনোই সম্ভব হবে না। এরপর তিনি বললেন, যে ঘরে প্রতিকৃতি থাকে সে ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করে না।”(বুখারী:২:৮৮১, মুসলিম:২:২০১)

৮. আলী রা: বলেন, “একবার আমি নবী স: কে আমার ঘরে দাওয়াত করলাম। তিনি ঘরে এসে প্রাণীর প্রতিকৃতি দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে গেলেন।” (নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

৯. আবু জুহায়ফা রা: বলেন, “নবী স: প্রতিকৃতি নির্মাণকারীদের কঠোর ভাষায় অভিসম্পাত করেছেন।” (বুখারী:২:৮৮১, আবু দাউদ)(বুখারী:৫৯৬২)

১০. আয়েশা রা: বলেন, “একদা নবী স: আমার ঘরে আসলেন। আমি তখন ছবি আছে এমন একটি চাদর আড়াল করে রাখছিলাম। নবীজীর স: চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল, তিনি তা নিয়ে ছিড়ে ফেললেন। এরপর বললেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী শাস্তি তাদের হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য করে।” (বুখারী:২:৮৮০, মুসলিম:২:২০০)

এভাবে মোট বারো জন সাহাবী নবীজী স: হতে মানুষ ও জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার হাদীস বর্ণনা করেছেন। যার সবকটির মর্ম প্রায় একই রকম।

হাদীসগুলোতে একটু লক্ষ করলেই আমরা দেখতে পাই যে, প্রতিকৃতি নির্মাণকারীকে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে এবং বলা হবে, যা বানিয়েছ তাতে প্রাণ দাও। আর সে তা কখনোই পারবে না। ফলে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য স্থাপনের ধৃষ্টতা প্রদর্শনের জন্য তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। কারণ প্রাণ দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি আল্লাহর একক উদ্ভাবন। তা অন্য কেউ সামান্য কপি করুক, তা আল্লাহ চান না। তিনি বলেন,

“তিনিই আল্লাহ, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, আকৃতি দানকারী।” (সূরা হাশর:২৪)

“তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের মাতৃগর্ভে যেমন ইচ্ছে তেমন আকৃতি দেন”। (সূরা আলে ইমরান:৬)

“আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের আকৃতি দিয়েছি”। (সূরা আ’রাফ:১১)

তিনি এক, তার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিতে সর্বক্ষেত্রে “এক”-ই থাকতে চান। তিনি “মুতাকাব্বির” বা অহংকারী। অহংকার তাঁর গুণ, তা তো তাকেই মানায়। বান্দার এতে সামান্য প্রশ্ন তোলারও অবকাশ নেই।

এসব হাদীসের ভিত্তিতেই প্রখ্যাত হাদীসবেত্তা ইমাম নববী বলেন, এ ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ একমত যে রূহ বিশিষ্ট প্রাণীর প্রতিকৃতি বানানো নিষিদ্ধ এবং হারাম। (ফাতাওয়াল ইসলাম, প্রশ্ন নং:৭২২২ ও ২০৮৯৪, মাকতাবা শামেলা)

মিশরে ২০০৬ সনে সেখানকার মুফতীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্রাণীর মূর্তি/ ভাস্কর্যকে নিষিদ্ধ করা হয়। (খালিজ টাইমস, আরব আমিরাতের দুবাই হতে প্রকাশিত দৈনিক, ২০০৬)

কুয়েতেও আলিমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ভাস্কর্যের অবৈধতা ঘোষণা করা হয়। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়াইতিয়্যাহ, কুয়েতের ইসলামী সমাধান সংকলন)

এছাড়া মক্কার সাবেক প্রধান খতীব ও প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (মৃত্যু: ১৪২১হি.) একই মত ব্যক্ত করেন। (শায়খ উসাইমিনের ফাতাওয়া সংকলন ‘লিকাউল বাবিল মাফতুহ’, প্রতিকৃতির বিধান)

সাউদীর সাবেক প্রধান মুফতী আব্দুল্লাহ বিন বায হতেও একই মত বর্ণিত আছে। (ফাতাওয়া ইবনে বায)

আসলে এতসব সহীহ হাদীস দ্বারা যখন কোন বিধান প্রমাণিত হয়, তখন মানবীয় যুক্তি দ্বারা তা পরিবর্তন করার কোন পথ থাকে না। আল্লাহ বলেন,

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে ফয়সালা দেন, তখন সে ব্যপারে কোন মুমিন নর-নারীর আর কোন স্বাধীনতা থাকবে না। এরপরও যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে, সে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত হবে।”(সূরা আহযাব:৩৬)

“রাসূল তোমাদের যা নির্দেশ দেন তা কর, আর যা করতে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। নিশ্চয় আল্লাহর শাস্তি খুব কঠিন”। (সূরা হাশর:৭)

এদিকে কেউ কেউ কাবা শরীফে মাদার মেরির ছবি থাকার কথা বলে মূর্তির বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, যা সম্পূর্ণই বানোয়াট। কেউ আবার ইসলামের বিধানে ইজতিহাদ বা কুরআন-হাদীস নির্ভর যুক্তির দ্বারা প্রাণীর মূর্তির বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ইজতিহাদ তো কেবল সে ক্ষেত্রেই করা যায় যে ক্ষেত্রে কোন সুস্পষ্ট বিধান কুর’আন ও হাদীসে দেয়া হয়নি। (পড়ুন কাবা শরীফে মাদার মেরির ছবি: বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা)

সার কথা, প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য স্বয়ং মূর্তি ও ভাস্কর্য হিসেবেই নিষিদ্ধ। তা পূজোর জন্যই হোক আর সম্মান বা সৌন্দর্য্যের জন্যই হোক। বরং পূজোর জন্য হলে তো তার নিষেধাজ্ঞা কেবল এসব হাদীসের আলোকে নয়, বরং তাওহীদ বিরোধী ‘শিরক’ এ লিপ্ত হওয়ার কারণে। অতএব রূহ বিশিষ্ট প্রাণী তথা মানুষ ও পশু পাখি ছাড়া যত কিছুর প্রতিকৃতি/ভাস্কর্য/মূর্তি হতে পারে, সবই ইসলামে বৈধ।

রাষ্ট্রে অবস্থিত মূর্তি ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে করণীয়:


প্রথম পর্বের আলোচনা দ্বারা তো এটা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হল যে প্রাণীর মূর্তি/ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ। কিন্তু তাই বলে যেসব ভাস্কর্য যুগ যুগ ধরে মানুষের শিল্প, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সাথে মিশে আছে সেগুলো কি ইসলাম ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়? এর উত্তর পেতে প্রথমে নিম্নের আয়াতগুলো পড়ুন।

১. “তোমরা তাদের মন্দ বলো না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। তাহলে তারাও ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবষত আল্লাহকে মন্দ বলবে। এমনিভাবে আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের কাজকর্ম সুশোভিত করে দিয়েছি। অতঃপর স্বীয় পালনকর্তার কাছে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে বলে দিবেন যা কিছু তারা করত”। (সূরা আল-আন’আম:১০৮)

২. আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভাল জানেন তাদেরকে, যারা সঠিক পথে আছে। (সূরা নাহল:১২৫)

৩. আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না। (সূরা বাকারা:২০৫)

৪. আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা মায়েদা:৬৪, সূরা কাসাস:৭৭)

৫. এবং হাঙ্গামা সৃষ্টিকারীদের পথে চলো না। (সূরা আ’রাফ:১৪২)

৬. এবং আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া:১০৭)

৭. অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তাভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। (সূরা ত্বাহা:৪৪)

প্রথম আয়াতটি দেখুন। এখানে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টতই এমন কিছু করতে বা বলতে নিষেধ করছেন যাতে মানুষ না বুঝে উল্টো আল্লাহকে বা ইসলামকেই মন্দ বলে। এতে প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কুরআন যে বিভিন্ন আয়াতে কঠোর ভাষায় প্রতিমাদের অচেতন, অজ্ঞান, শক্তিহীন ও অসহায় হওয়ার কথা ব্যক্ত করেছে? এর উত্তর হল যে, এসব ক্ষেত্রে বিতর্ক হিসেবে সত্য ফুটিয়ে তুলতে এভাবে বলা হয়েছে। যেন বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই তাদের প্রকৃত স্বরূপ বুঝে নিতে পারে এবং যারা বুঝতে পারে না তাদের ভ্রান্তি ও অদূরদর্শিতাও ফুটে ওঠে। এটা অনেকটা আদালতের সামনে সত্য বিবৃতি দেয়ার ন্যায় কিংবা ডাক্তারের সামনে রোগীর দোষ বর্ণনার ন্যায়।

এ আয়াত থেকে ফকীহগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বের করেন। তা হল, যে কাজ নিজ সত্তার দিক দিয়ে বৈধ এবং কোন-না-কোন স্তরে প্রশংসনীয়ও বটে, কিন্তু সে কাজ করলে কোন ফাসাদ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে কিংবা তার ফলশ্রুতিতে মানুষ গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে সে কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। উল্লিখিত আয়াতে মিথ্যা উপাস্য অর্থাৎ প্রতিমাদের মন্দ বলা ইমানী দায়িত্ব ও কমপক্ষে বৈধ মনে হলেও যদি সে ক্ষেত্রে এ আশংকা দেখা দেয় যে, প্রতিমা পূজারীরাও আল্লাহ তায়ালাকে মন্দ বলবে, তাহলে তখন এ বৈধ কাজটিও নিষেধ করা হয়েছে। (মাআ’রেফুল কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃ:৩৮৮-৩৯৭, মূল মাওলানা মুফতী শফী রহ:, অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত)

ইমাম বুখারী রহ: এ বিষয়ে একটা ভিন্ন অধ্যায়ই উল্লেখ করেছেন। যার শিরোনাম হল, “যে ব্যক্তি কোন পছন্দনীয় কাজ ছেড়ে দেয় এ আশংকায় যে, এতে হয়ত কেউ না বুঝে এর চেয়েও বড় কোন অপরাধে লিপ্ত হবে”। এ অধ্যায়ের অধীনে তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করেন, যা একটি ঘটনার সার সংক্ষেপ।

ঘটনাটি হল, একবার রাসূলুল্লাহ স: হযরত আয়েশা রা: কে বললেন, “জাহিলিয়াত যুগে এক দুর্ঘটনায় কা’বাগৃহ বিধ্বস্ত হয়ে গেলে কুরায়শরা তার পূননির্মাণ করে। এ পুননির্মাণে কয়েকটি বিষয় প্রাচীন ইবরাহিমী ভিত্তির সাথে সামঞ্জস্য রাখা হয়নি। প্রথমত কাবার যে অংশকে বর্তমানে হাতীম বলা হয়, তাও কা’বাগৃহের অংশ-বিশেষ ছিল। কিন্তু অর্থাভাবে পূননির্মাণে সে অংশ বাদ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত কা’বাগৃহের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দু’টি দরজা ছিল। একটি প্রবেশের, অপরটি প্রস্থানের। জাহিলিয়াত যুগে নির্মাতারা পশ্চিম দিকের দরজা বন্ধ করে একটি মাত্র দরজা রাখে। আর তাও ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চে স্থাপন করে, যাতে কা’বাগৃহে প্রবেশ কেবল তাদের ইচ্ছানুযায়ী হতে পারে। রাসূলুল্লাহ স: আরও বলেন, আমার আন্তরিক বাসনা এই যে, কা’বাগৃহের বর্তমান নির্মাণ ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ-রূপে ইবরাহীম আ: এর নির্মাণের অনুরূপ করে দিই। কিন্তু আশংকা এই যে, তোমার সম্প্রদায় অর্থাৎ আরব জাতি তো নতুন নতুন মুসলমান হয়েছে। কা’বাগৃহ বিধ্বস্ত করলে তাদের মনে বিরূপ সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তাই আমি আমার বাসনা মুলতবি রেখেছি”। (মাআ’রেফুল কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃ:৩৮৮-৩৯৭ এবং বুখারী শরীফ, কিতাবুল ইলম, ৪৮ নং অধ্যায়)

তবে এ মূলনীতির ক্ষেত্রে শর্ত হল, যে বৈধ কাজটি নিষিদ্ধ করা হয়, তা যেন ইসলামের উদ্দিষ্ট ও জরুরী কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত না হয়। যেমন মিথ্যা উপাস্যদেরকে মন্দ বলা ও কা’বাগৃহকে ইবরাহীমী ভিত্তির অনুরূপ করা -এগুলোর উপর ইসলামের কোন উদ্দেশ্য নির্ভরশীল নয়। তাই এগুলোর কারণে যখন কোন ধর্মীয় অনিষ্টের আশংকা দেখা দেয়, তখন এগুলো পরিত্যক্ত হবে। আর যে কাজটি ইসলামী উদ্দেশ্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত—ফরয, ওয়াজীব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ অথবা অন্য কোন প্রকার ইসলামী বৈশিষ্ট্য, তা করলে যদিও কিছু স্বল্পজ্ঞানী লোক ভুল বোঝাবুঝিতে লিপ্ত হয়, তবু এ কাজ কখনও ত্যাগ করা যাবে না। বরং অন্য পন্থায় তাদের ভুল বোঝাবুঝি ও ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করা হবে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফের মুশরিকদের মন্দ বলা সত্ত্বেও মুসলমানদের নামায না ছাড়া এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। (প্রাগুক্ত)

সার কথা, যে কাজ ইসলামী উদ্দেশ্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত তা কখনো ত্যাগ করা যাবে না। আর যে কাজ ইসলামী উদ্দেশ্যাবলীর অন্তর্ভুক্ত নয় এবং যা ত্যাগ করলে কোন ধর্মীয় উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় না, এ ধরনের কাজ অপরের ভুল বোঝাবুঝি অথবা ভ্রান্তির আশংকার কারণে পরিত্যাগ করা যাবে। (আরো বিস্তারিত পড়ুন -মাআ’রেফুল কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃ:৩৮৮-৩৯৭, মূল মাওলানা মুফতী শফী রহ:, অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন হতে প্রকাশিত)

অন্য আয়াতগুলো দেখুন। আল্লাহ বলছেন মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে বুঝিয়ে শুনিয়ে, উত্তম পন্থায় ও উৎকৃষ্ট আচরণের দ্বারা। দাঙ্গা হাঙ্গামা তিনি কখনো পছন্দ করেন না। নবীজী স: কে তিনি পাঠিয়েছেনই এসব দাঙ্গা হাঙ্গামার অবসান ঘটাতে, বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বানিয়ে।

অতএব যে ভাস্কর্যের সাথে মানুষের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও চেতনা জড়িয়ে আছে, এভাবে রাতের আধারে গিয়ে তা ভাঙা কখনোই ইসলাম সমর্থিত পথ নয়। বরং এটা নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা, জ্ঞানহীনতা, অসতর্কতা এবং ইসলামকে ভুল ভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কেউ যদি তাতে রাজনৈতিক গন্ধ পায় তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। সমাজের সর্বস্তরে শান্তি বজায় রাখতে ইসলাম সর্বদা সর্বোচ্চ নির্দেশ দিয়েছে। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, মুসলিম-অমুসলিম সকলের সাথে ভাল ব্যবহার করাই ইসলামের আদর্শ। সন্ত্রাস, দাঙ্গা-হাঙ্গামা কখনোই ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না।

আর এয়ারপোর্টের সামনে যা ঘটেছে তা নিতান্তই উসকানি ছিল বলে মনে হয়। সরকারকে তাই এমন পরিণতি দেখতেই হয়েছে। মাদ্রাসা ছাত্রদের এহেন ভূমিকা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রত্যেক বিবাদেরই শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে, এখানেও তা হতে পারত। কিন্তু সরকার নিজেই যখন জনগণের সেন্টিমেন্টে আঘাত করে, তখন জনগণ এর জবাবে সেন্টিমেন্ট তো হবেই; আমরা তখন কাকে দোষারোপ করতে পারি?

কারো সংস্কৃতিতে আঘাত হানা যেমন কাম্য নয়, তেমনি কারো ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত হানা কাম্য নয়। কেনই বা সেখানে বাউল হবে, আর কেনই বা সেখানে হজ্জ্ব মিনার হবে? অত্যাধুনিক ফোয়ারা বা অন্যকিছু হলে খারাপ কি হত? এদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ্য মানুষ মুসলিম, এ কথা কখনোই ভুলে যাওয়া রাখা উচিৎ নয়। (দেখুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের ২ এর ক অনুচ্ছেদ)

সবশেষে পুরো আর্টিকেলটার মূল কথাগুলো তুলে ধরছি।

১. মূর্তি ও ভাস্কর্য, পূজো ও সৌন্দর্য্য -এসব বিভাজন ছাড়াই ইসলামে প্রাণীর যে কোন প্রকার প্রতিকৃতিই নিষিদ্ধ। তা অস্বীকার করলে কুরআন ও হাদীসের বিধানে ‘তাহরীফ’ বা অবৈধ পরিবর্তন বলে গণ্য হবে।

২. তবে বলাকা বা অন্য যে কোন ভাস্কর্য এভাবে ভাঙা ইসলাম সম্মত নয়। বরং তা নিশ্চিতভাবেই মানুষের সামনে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার নামান্তর কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর কোন চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ। বাউল ভাস্কর্যও এভাবে ভাঙা ঠিক হয়নি। তবে তা এভাবে বানানোও উচিৎ হয়নি।

বি:দ্র: লেখাটাকে যথাসম্ভব অথেনটিক করার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে। আবার সংক্ষিপ্ত করার প্রতিও বিশেষ লক্ষ রাখতে হয়েছে। নতুন লেখক বলে ভুল ভ্রান্তি থাকতেই পারে। তবে তথ্যগত কোন ভুল না থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আরো বিস্তারিত অধ্যয়নের জন্য দেখতে পারেন আমার তথ্যপুঞ্জি:
১. আল-কুরআন
২. সহীহ বুখারী, রশীদিয়া লাইব্ররী, দিল্লী
৩. সহীহ মুসলিম, রশীদিয়া লাইব্ররী, দিল্লী
৩. সুনানে তিরমিযী, রশীদিয়া লাইব্ররী, দিল্লী
৪. সুনানে আবু দাউদ, রশীদিয়া লাইব্ররী, দিল্লী
৫. মিরকাত শরহে মিশকাত, মোল্লা আলী আল কারী রহ:, মাকতাবা শামেলা
৬. তাহরীমুত তাসউইর, একটি প্রবন্ধ, মাকতাবা শামেলা
৭. মাআরেফুল কুরআন –বাংলা, সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
৮. ফাতাওয়াল ইসলাম, মাকতাবা শামেলা
৯. লিকাউল বাবিল মাফতুহ, শায়খ উসাইমিনে ফাত্‌ওয়া সমগ্র, মাকতাবা শামেলা
১০. ফাতাওয়াল আযহার, আল আযহার ইউনিভার্সিটি কর্তৃক প্রদত্ত ফাত্‌ওয়ার সংকলন, মাকতাবা শামেলা
১১. ফাতাওয়াশ শাবাকাতিল ইসলামিয়া, মাকতাবা শামেলা
১২. মাকতাবা শামেলা, ডিজিটাল ইসলামী লাইব্রেরী
১৩. আল কাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮ সংখ্যা, মারকাযুদ দাওয়া আল ইসলামিয়া হতে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা


কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১. আজব ভাই ও আরো অনেক সহব্লগার, যাদের লেখার প্রেক্ষিতেই এ লেখার জন্ম।
২. আমার প্রিয় দু’জন শিক্ষক, আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহয়া সাহেব এবং আবু সাবের আব্দুল্লাহ সাহেব, যাদের সাথে আলোচনায় আমার অনেক বিষয় ক্লিয়ার হয়েছে।
৩. অপর শিক্ষক, আরীফুদ্দীন মারূফ সাহেব, যার মুখে ইসলামের এতসুন্দর ব্যাখ্যাটা শুনেছিলাম। (যা আমি দ্বিতীয় প্যারায় উল্লেখ করেছি।)
আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামের শান্তিপূর্ণ ম্যাসেজ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার তাওফীক দিন, আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।

প্রথম প্রকাশ ৫ই ডিসেম্বর ২০০৮, প্রথম আলো ব্লগে

Welcome



Dear visitor, Please visit my new site: http://yousufsultan.com/